বিবাহিত জীবনে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর ভরণপোষণ একটি মৌলিক অধিকার। একজন বিবাহিত নারী তার স্বামীর কাছ থেকে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়ার অধিকারী। প্রচলিত কথায় এটিকে খোরপোষ বা ইংরেজিতে Maintenance বলা হয়। স্বামী আইনসংগত কারণ ছাড়া কোনো ক্রমেই স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করতে পারেন না।
কখন স্বামী ভরণপোষণ দিতে বাধ্য নন?
কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্বামী তার স্ত্রীকে ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকেন না:
- যদি স্ত্রী স্বামীর অবাধ্য হন।
- স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রী স্বেচ্ছায় স্বামীর বাড়ি ত্যাগ করেন।
- স্ত্রী যদি স্বামীর সাথে বসবাস করতে না চান।
- স্ত্রী যদি স্বামীর সাথে সহবাসে অস্বীকৃতি জানান।
তবে মনে রাখবেন, যদি স্বামী জোরপূর্বক তার স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেন, সেক্ষেত্রে স্ত্রী বাবার বাড়ি বা অন্যত্র বসবাস করলেও তার ভরণপোষণের অধিকার খর্ব হয় না।
স্বামী ভরণপোষণ না দিলে প্রতিকার কী?
স্বামী যদি যথাযথভাবে ভরণপোষণ না দেন, তাহলে আইন আদালতের মাধ্যমে তা আদায় করে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। মূলত দুটি প্রধান উপায়ে এটি করা যেতে পারে:
১. ইউনিয়ন পরিষদের সালিশী পরিষদে আবেদনের মাধ্যমে।
২. পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করে।
এছাড়াও, আর্থিক অস্বচ্ছলদের জন্য জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমেও আইনগত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ আছে।
১. সালিশী পরিষদে আবেদন
স্বামী যদি তার স্ত্রীকে পর্যাপ্ত ভরণপোষণ দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে স্ত্রী তার স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করতে পারেন।
- সালিশী পরিষদ গঠন: চেয়ারম্যান তখন উভয়পক্ষের একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে একটি সালিশী পরিষদ (Arbitration Council) গঠন করবেন।
- ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণ: সালিশী পরিষদ ভরণপোষণের পরিমাণ বা হার কত হবে, তা নির্ধারণ করে একটি সার্টিফিকেট ইস্যু করবে।
- আপিলের সুযোগ: সালিশী পরিষদের সিদ্ধান্তে যদি কোনো পক্ষ সংক্ষুব্ধ হন, তাহলে স্থানীয় এখতিয়ারসম্পন্ন সহকারী জজ আদালতে আপিল বা রিভিশন দায়ের করা যাবে।
২. পারিবারিক আদালতে মামলা
স্বামী যথাযথভাবে ভরণপোষণ না দিলে পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ (পূর্বের আইন অনুযায়ী পারিবারিক আদালত আইন, ১৯৮৫) এর অধীনে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে ভরণপোষণের মামলা দায়ের করে স্বামীকে উপযুক্ত ভরণপোষণ দিতে বাধ্য করতে পারেন।
- আরজি দায়ের: একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর শরণাপন্ন হয়ে আপনার দাবি-দাওয়া উল্লেখ করে আদালতে একটি আরজি (আবেদনপত্র) দাখিল করতে হবে।
- আরজিতে যা উল্লেখ করতে হবে: আরজিতে অবশ্যই নিম্নলিখিত বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে:
- স্বামী কত তারিখ থেকে ভরণপোষণ দিচ্ছেন না।
- স্ত্রী কত তারিখে স্বামীর কাছে ভরণপোষণ দাবি করেছিলেন।
- স্ত্রীর দাবির প্রেক্ষিতে স্বামী ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করেছিলেন কি না।
- স্বামীর আর্থ-সামাজিক ও শারীরিক অবস্থা কেমন।
- স্ত্রী মাসিক কত টাকা হারে ভরণপোষণ (মোহরানা নয়, এটি খোরপোষ) দাবি করছেন।
- স্ত্রী পূর্বের বকেয়া কোনো ভরণপোষণ দাবি করছেন কি না, করলে কত তারিখ থেকে।
মনে রাখবেন এর কোনো একটি বিষয় বাদ পড়লে আরজিটি ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে এবং মামলার ক্ষতি হতে পারে। আরজির সাথে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যেমন নিকাহনামার কপি, বাদীর জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি ইত্যাদি দাখিল করতে হবে। যদি নাবালক বাচ্চার ভরণপোষণ দাবি করা হয়, তবে সেটিও আরজির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং বাচ্চার জন্মনিবন্ধন সনদ বা টিকা কার্ডের কপি জমা দিতে হবে।
৩. জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সহায়তা
উপরে উল্লিখিত দুটি উপায় ছাড়াও, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে আবেদন করে ভরণপোষণ বিষয়ে আপোস-মীমাংসার পথ খোলা রয়েছে। দরিদ্র, দুঃস্থ, অসহায়দের জন্য আইনগত পরামর্শ ছাড়াও, এই অফিস প্রয়োজন অনুযায়ী মামলা পরিচালনার যাবতীয় ব্যয়ভার প্রদান করে থাকে। প্রতিটি জেলায় জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনে বা তার কাছাকাছি জেলা লিগ্যাল এইড অফিস অবস্থিত।
আইন জানুন, আইন মানুন, সুন্দর ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করুন। ধৈর্য ধরে পড়ার জন্য ধন্যবাদ।