স্বামী অত্যাচার-নির্যাতন করে বাড়ি থেকে বের করে দিলে আপনার করণীয় কী?

আমাদের সমাজে স্বামীর হাতে স্ত্রী শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে বাড়ি থেকে বিতাড়িত হওয়ার ঘটনা দুঃখজনকভাবে প্রায়শই ঘটে থাকে। অনেক সময় যৌতুকের দাবি, মাদকাসক্তি বা পরকীয়ার মতো কারণে স্বামীরা স্ত্রীদের ওপর নির্যাতন চালান। এই ধরনের পরিস্থিতিতে অনেক নারী সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য মুখ বুজে সবকিছু সহ্য করেন। কিন্তু এমনও সময় আসে যখন আইনের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

নির্যাতিত নারীর প্রতীকী ছবি।

এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করব, স্বামী কর্তৃক নির্যাতনের ধরন অনুযায়ী স্ত্রীর কী কী আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ আছে এবং কীভাবে সেই প্রতিকারগুলো চাইতে পারবেন। (মনে রাখবেন, স্বামীও নির্যাতনের শিকার হতে পারেন, সেই বিষয়ে আমরা অন্য একটি আর্টিকেলে আলোচনা করব।)


নির্যাতনের ধরন ও আইনি প্রতিকার

নির্যাতনের ধরন অনুযায়ী আইনগত প্রতিকার ভিন্ন হতে পারে। এখানে কিছু সাধারণ পরিস্থিতি এবং সেগুলোর আইনি সমাধান তুলে ধরা হলো:

১. যৌতুকের দাবিতে শারীরিক নির্যাতন

স্বামী বা তার পরিবারের কেউ যদি যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে, তবে তা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ অনুযায়ী একটি গুরুতর অপরাধ।

  • গুরুতর জখম: এই আইনের ১১(খ) ধারা অনুযায়ী, যৌতুকের দাবিতে নারীকে গুরুতর জখম করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। এক্ষেত্রে সাজার পরিমাণ কোনোভাবেই ৫ বছরের কম হবে না। কারাদণ্ডের পাশাপাশি অর্থদণ্ডও হবে।
  • সাধারণ জখম: যদি জখম গুরুতর না হয়ে সাধারণ প্রকৃতির হয়, তাহলে সর্বোচ্চ ৫ বছর এবং সর্বনিম্ন ২ বছর কারাদণ্ড হবে, সাথে অর্থদণ্ডও থাকবে।

গুরুত্বপূর্ণ: যৌতুকের দাবিতে শারীরিক নির্যাতন করা এবং শুধু যৌতুক দাবি করা — এই দুটি ভিন্ন অপরাধ।

২. শুধু যৌতুক দাবি করলে (শারীরিক নির্যাতন ছাড়া)

যদি স্বামী কোনো শারীরিক নির্যাতন না করে শুধুমাত্র যৌতুক দাবি করেন, তাহলে যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ এর ৩ ধারা অনুযায়ী মামলা করার সুযোগ আছে।

  • যৌতুকের দাবি প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৫ বছর, সর্বনিম্ন ১ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫০,০০০/- টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

৩. যৌতুকের দাবিতে শারীরিক নির্যাতন করে বাড়ি থেকে বের করে দিলে

যদি যৌতুকের দাবিতে শারীরিক নির্যাতন করে স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়, তাহলে ওপরের প্রতিকারগুলো ছাড়াও স্ত্রী আরও কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন:

  • বকেয়া মোহরানা ও ভরণপোষণ: স্ত্রী পারিবারিক আদালতে স্বামী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে বকেয়া মোহরানা এবং ভরণপোষণের দাবিতে মামলা দায়ের করতে পারবেন।
  • ভরণপোষণের দায়: যদি স্ত্রী স্বামীর প্রতি অনুগত থাকতে এবং তার তত্ত্বাবধানে থাকতে চাওয়ার পরও স্বামী তাকে তাড়িয়ে দেন, তাহলে সেই স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়ভার স্বামীর ওপরই বর্তায়।
  • মোহরানা আদায়: মোহরানার কোনো অংশ বকেয়া থাকলে স্ত্রী সেটিও আদায় করে নিতে পারেন।

৪. মানসিক নির্যাতন এবং বাড়ি থেকে বের করে দিলে

অনেক নারীর প্রশ্ন থাকে, শুধুমাত্র মানসিক নির্যাতন করা হলে স্ত্রী কি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ অনুযায়ী মামলা করতে পারবেন? এর উত্তর হলো না, পারবেন না

  • বিবাহ বিচ্ছেদ: মানসিক নির্যাতনের শিকার হলে স্ত্রী The Dissolution of Muslim Marriage Act, 1939 অনুযায়ী আদালতে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
  • ভরণপোষণ ও মোহরানা: মানসিক নির্যাতনের কারণে বাড়ি থেকে বের করে দিলে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে বকেয়া মোহরানা এবং ভরণপোষণের দাবিতে মামলা করতে পারবেন।

কোথায় যাবেন এবং কী করবেন?

যদি আপনি স্বামী বা তার পরিবারের কারও দ্বারা শারীরিক বা মানসিকভাবে নির্যাতিত হয়ে থাকেন এবং বাড়ি থেকে বিতাড়িত হন, তাহলে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:

  • চিকিৎসা ও প্রমাণ সংগ্রহ: প্রথমেই নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিন। কর্তব্যরত চিকিৎসককে আপনার জখমের প্রকৃত ঘটনা বিস্তারিতভাবে জানান। এটি আপনার মামলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।
  • থানায় মামলা দায়ের: প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষে নিকটস্থ থানায় মামলা দায়ের করুন। পুলিশ যদি কোনো কারণে মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর শরণাপন্ন হয়ে সরাসরি সংশ্লিষ্ট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালে মামলা দায়ের করতে পারবেন।
  • যৌতুক নিরোধ আইনের মামলা: যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী যৌতুকের মামলা দায়ের করতে হবে চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। মহানগর (মেট্রোপলিটন) এলাকার ক্ষেত্রে এটি চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করতে হবে।
  • আর্থিক সহায়তার জন্য লিগ্যাল এইড: যদি আপনি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল না হন এবং মামলার ব্যয়ভার বহন করতে অক্ষম হন, তাহলে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সহযোগিতা গ্রহণ করতে পারেন। বাংলাদেশ সরকার গরীব, দুঃস্থ ও অসহায় নারী, পুরুষ ও শিশুদের মামলার ব্যয়ভার বহন করে।
    • কোথায় পাবেন: প্রত্যেক জেলার জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবন বা তার পাশেই জেলা লিগ্যাল এইড অফিস রয়েছে।
    • সুবিধা: বিচারকদের মধ্য থেকেই জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার পদে পদায়ন করা হয়, তাই তিনি আইন বিষয়ে অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও দক্ষ হয়ে থাকেন। আপনার পক্ষে আইনজীবী নিযুক্ত করা থেকে শুরু করে যাবতীয় আইনানুগ সেবা দিতে তিনি বদ্ধপরিকর।
    • হেল্পলাইন: জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার একটি হেল্পলাইন রয়েছে। আপনারা ১৬৪৩০ নম্বরে কল করেও আইনগত সহায়তা পেতে পারেন।

সঠিক আইন জানুন, আইন মানুন, সুন্দর ও সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করুন।

মনে রাখবেন, কোনো ধরণের নির্যাতনই গ্রহণযোগ্য নয়। আপনার অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকুন এবং প্রয়োজনে আইনি সহায়তা নিতে দ্বিধা করবেন না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *