ন্যায় বিচার পাওয়া সকল মানুষের মৌলিক মানবাধিকার। আমাদের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান এবং সকলেই আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। তবে বাস্তবতা হলো আইনের আশ্রয় লাভ করতে হলে নানা আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় যেটি অনেক ক্ষেত্রেই বেশ ব্যয়বহুল। সমাজে যাদের অর্থ বিত্ত কম তারা প্রায়শই আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার হতে বঞ্চিত হয়ে থাকেন। আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে যেন কেউ আইনের আশ্রয় গ্রহণ হতে বঞ্চিত না হন, ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকলেই যেন ন্যায়বিচার লাভ করতে পারেন সেই মহৎ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকার সরকারি ভাবে লিগ্যাল এইড কার্যক্রমের মাধ্যমে আইনগত সেবা প্রদান করে থাকেন। এই লিগ্যাল এইড কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে মূখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস।

জেলা লিগ্যাল এইড অফিস: কি ধরণের সেবা প্রদান করে?
দেশের প্রতিটি জেলার জেলা ও দায়রা জজ কোর্ট ভবন বা এর সন্নিকটেই জেলা লিগ্যাল এইড অফিস অবস্থিত। এসব অফিসের প্রধান কাজ হলো আর্থিকভাবে অসচ্ছল, অসহায় এবং বিচার প্রাপ্তিতে অসমর্থ মানুষকে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদান করা। এই সহায়তা কেবল মামলা পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর পরিধি অনেক বিস্তৃত। জেলা লিগ্যাল এইড অফিস যেসব গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদান করে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- আইনি পরামর্শ ও তথ্য প্রদান: যেকোনো আইনি বিষয়ে বিনামূল্যে পরামর্শ প্রদান করা। ধনী-গরীব নির্বিশেষে সকলেই আইনি পরামর্শ ও তথ্য পেতে পারেন। প্রচলিত আইনে আপনার অধিকার, আপনার করণীয় ইত্যাদি বিষয়ে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে সাম্যক ধারণা ও পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
- বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (Alternative Dispute Resolution- ADR): মামলা দায়েরের আগে বা চলমান অবস্থায় আপসযোগ্য বিরোধ মীমাংসার ব্যবস্থা করা। এর মাধ্যমে দ্রুত ও কম খরচে সমস্যার সমাধান করা যায়। এই সেবাও ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলেই পাবার অধিকারী।
- আইনজীবী নিয়োগ: মামলা পরিচালনার জন্য প্যানেলভুক্ত বিজ্ঞ আইনজীবীর মধ্য থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ আইনজীবীকে নিয়োগ করা হয়।
- মামলার খরচ বহন: সরকারি লিগ্যাল এইড তহবিল থেকে মামলা দায়ের, পরিচালনা, কোর্ট ফি, ডিএনএ টেস্ট, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ ইত্যাদি ব্যয় বহন করা হয়।
- আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি: জনগণের মধ্যে আইনি অধিকার ও সরকারি আইনি সেবা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা।
যারা লিগ্যাল এইড পাওয়ার যোগ্য
আইনি তথ্য ও পরামর্শ প্রদান এবং আপোস-মীমাংসার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ধনী-গরীব বিবেচনা করা হয় না। তবে আইনগত সহায়তা, যেমন- আইনজীবী নিয়োগ, মামলার খরচ বহন সংক্রান্ত বিষয়ে সেবা পেতে হলে কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়, কারণ এই সেবাগুলো কেবল সমাজের অসহায়, গরীব মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করেই চালু করা হয়েছে। আইনগত সহায়তা প্রদান নীতিমালা অনুযায়ী যারা এই সেবা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন:
- বার্ষিক ১,০০,০০০ টাকার বেশি আয় করতে অক্ষম ব্যক্তি।
- মুক্তিযোদ্ধা যাদের বার্ষিক আয় ৭৫,০০০ টাকার বেশি নয়।
- বয়স্ক ভাতা, ভিজিডি কার্ডধারী দুঃস্থ মাতা, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা ও দুঃস্থ মহিলা।
- পাচারের শিকার নারী বা শিশু এবং এসিড দগ্ধ নারী বা শিশু।
- প্রতিবন্ধী ও উপার্জনে অক্ষম ব্যক্তি।
- বিনা বিচারে আটক ব্যক্তি।
- জেল কর্তৃপক্ষ বা আদালত কর্তৃক আর্থিকভাবে অসহায় বা অসচ্ছল হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তি।
তবে বাস্তবতা হলো কেউ আপত্তি বা বিরোধিতা না করলে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস সাধারণত এই বিষয়গুলোকে উদার ভাবেই দেখে থাকে।
কিভাবে এই সেবা পাওয়া যায়?
জেলা লিগ্যাল এইড অফিস থেকে সেবা পাওয়া খুবই সহজ এবং এটি একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
- আবেদন: প্রথমে জেলা কমিটির চেয়ারম্যান বরাবর একটি আবেদন করতে হয়। আবেদন ফরম জেলা লিগ্যাল এইড অফিস, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কার্যালয় অথবা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার থেকে সংগ্রহ করা যায়। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে গেলে আবেদন ফর্ম প্রাপ্তি ও আবেদন বিষয়ে যাবতীয় সহযোগিতা তারই করে থাকেন। আপনার কাজ হলো লিগ্যাল এইড অফিস খুঁজে বের করা এবং সেখানে আপনার সমস্যাটি জানানো।
- যাচাই-বাছাই: আবেদন জমা দেওয়ার পর জেলা কমিটি আবেদনকারীর আর্থিক অসচ্ছলতা এবং অন্যান্য যোগ্যতা যাচাই-বাছাই করে। এই বিষয়টি বাস্তবে অনেক উদার ভাবে দেখা হয়ে থাকে। বিশেষ আপত্তি না থাকলে আবেদনকারী সকলকেই লিগ্যাল এইড সেবা প্রদান করা হয়।
- আইনজীবী নিয়োগ: আবেদনকারীর আবেদন বিবেচনা করে যদি দেখা যায় আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী নিযুক্ত করা প্রয়োজন তাহলে, কমিটি মনোনীত প্যানেল আইনজীবীদের মধ্য থেকে একজন আইনজীবী নিয়োগ করে দেন।
- যোগাযোগ: যেকোনো প্রয়োজনে সরাসরি জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সাথে অথবা জাতীয় হেল্পলাইন কল সেন্টার ১৬৪৩০ নম্বরে ফোন করে বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ ও তথ্য পাওয়া যায়।
লিগ্যাল এইড কার্যক্রমের বিস্তৃতি
‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন-২০০০’ এর অধীনে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংস্থার তত্ত্বাবধানে লিগ্যাল এইড কার্যক্রম পরিচালিত হয়। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের পাশাপাশি সারাদেশে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও লিগ্যাল এইড কমিটি রয়েছে। এর ফলে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষও সহজেই সরকারি আইনি সহায়তার আওতায় আসতে পারে।
এছাড়া, সুপ্রিম কোর্টে আপিল ও অন্যান্য উচ্চ আদালতের মামলা পরিচালনার জন্য সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিস রয়েছে। শ্রমিকদের জন্য শ্রম আদালতে বিশেষ লিগ্যাল এইড কমিটিও কাজ করে।
সরকারি আইনি সহায়তার মূল লক্ষ্য হলো আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে যেন কোনো ব্যক্তি বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়। এই কার্যক্রমের ফলে অসংখ্য গরিব ও অসহায় মানুষ তাদের আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারছে, যা একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সর্বোত্তম পন্থা হলো আপোস মীমাংসার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি। তাই বিরোধ হলে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সহযোগিতা গ্রহণ করুন।