অগ্রক্রয়ের অধিকার বলতে মূলত বুঝায় কোন সম্পত্তি ক্রয়ের ক্ষেত্রে তৃতীয় কোন ব্যক্তির চাইতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ক্রয়ের অধিকার। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে- জামাল ও কামাল দুই ভাই। তারা পৈত্রিক সূত্রে ৫ কাঠা করে ১০ কাঠা জমি পেয়েছে। জামাল তার অংশের ৫ কাঠা বিক্রয় করতে চায়। জামাল জনৈক রফিকের কাছে জমিটি বিক্রয় করলো। বিক্রয়ের পর বিষয়টি জানতে পেরে কামাল বলে বিক্রয়ের বিষয়টি সে যদি জানতো তাহলে সে নিজেই জমিটি ক্রয় করত। এখানে জমিটি ক্রয়ের ক্ষেত্রে কামালের অধিকার অন্য যেকারো থেকে বেশি। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কামালের এই জমিটি ক্রয়ের অধিকারকেই আইনে অগ্রক্রয়ের অধিকার এবং ইংরেজিতে Right to pre-emption বলে অবিহিত করা হয়। সাধারণ মানুষ অনেকে এটিকে ‘পেমশন’ বলেও জেনে ও বুঝে থাকে।

আমাদের দেশে অগ্রক্রয় বিষয়ে বিধিবদ্ধ আইন রয়েছে এছাড়া ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী ‘হক-সূফা’ এর বিধি-বিধানও চালু রয়েছে। ‘হক-সূফা’ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে এই আর্টিকেলের শেষে দেয়া লিংকে ভিজিট করতে পারেন। আজকের এই লেখায় আমরা বাংলাদেশের বিধিবদ্ধ আইনে অগ্রক্রয়ের বিভিন্ন দিক আলোচনা করবো।
কৃষি জমি এবং অকৃষি জমির ক্ষেত্র অগ্রক্রয়ের আলাদা আলাদা নিয়ম কানুন রয়েছে। কৃষি জমির ক্ষেত্রে The State Acquisition and Tenancy Act, 1950 প্রযোজ্য অপর দিকে অকৃষি জমির ক্ষেত্রে The Non-agricultural Tenancy Act, 1949 প্রযোজ্য হয়ে থাকে। প্রথমে কৃষি জমির অগ্রক্রয় বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো-
কৃষি জমির ক্ষেত্রে অগ্রক্রয়
কৃষি জমির অগ্রক্রয়ের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ এর ৯৬ ধারা প্রযোজ্য হয়ে থাকে। কৃষি জমি বলতে বুঝায় যে সকল জমিতে চাষাবাদ হয়ে থেকে, যেমন- ফসলি জমি, মাছ চাষের পুকুর/জলাধার, ফলের বাগান, পতিত কৃষি জমি ইত্যাদি। তবে বসত ভিটা কৃষি জমি হিসেবে বিবেচিত হবে না। এছাড়া সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার আওতাভুক্ত সকল জমি (কৃষি বা অকৃষি যেটাই হোক না কেন) অকৃষি হিসেবেই বিবেচিত হবে। সেগুলো অত্র আইনের আওতাভুক্ত হবে না।
কৃষি জমিতে কখন অগ্রক্রয়ের অধিকার জন্মায়: কোন জোত (Holding) এর সহ-অংশীদার তার অংশের জমি বিক্রয় করতে চাইলে সেই জমি ক্রয়ের সব থেকে বেশি অধিকার থাকে অপর সহ-অংশীদারের। অপর সহ-অংশীদার বা অংশীদারদের অবগত না করে তৃতীয় কোন ব্যক্তির (Stranger) নিকট বিক্রয় করা হলে সহ-অংশীদারের অনুকূলে অগ্রক্রয়ের অধিকার জন্মায়। অবগত কেবল মৌখিক ভাবে করাই যথেষ্ট নয়, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ এর ৮৯ ধারা অনুযায়ী অপরাপর সকল সহ-অংশীদারদের নোটিশ প্রদান করে বিষয়টি অবগত করতে হবে। নোটিশ প্রদানের বিষয়টি অতীব জরুরী। যথাযথ ভাবে নোটিশ প্রদান করা না হলে সহ-অংশীদার দাবি করতে পারেন তিনি বিক্রয় বিষয়ে কিছুই জানতেন না।
এখন প্রশ্ন হলো জোত (Holding) বলতে কী বুঝায়। সহজ ভাবে বলতে গেলে হোল্ডিং বলতে বুঝায় জমির একটি নির্দিষ্ট অংশ বা প্লট। একটি দাগের সম্পত্তি নামজারি হয়ে বিভিন্ন হোল্ডিং বা জোতে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। কৃষি জমির ক্ষেত্রে হোল্ডিং বা জোত খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই বিষয়টি উদাহরণ দিয়ে পরিস্কার করার চেষ্টা করছি।
ধরুন, রফিক ও শফিকের নামে আরএস ২০৫ নং খতিয়ানের ১০৭ নং দাগে ৪০ শতক সম্পত্তি অর্ধেক অর্ধেক অংশে রয়েছে। রফিক ও শফিক এই সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নামজারি করে নেয়নি। তাহলে বলা যায় ১০৭ নং দাগ একটি হোল্ডিং বা জোত হিসেবে রয়েছে। এই ক্ষেত্রে রফিক ও শফিক একে অপরের সহ-অংশীদার।
আবার, রফিক ও শফিক যদি নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিজ নিজ নামে নামজারি করে নেয়, তাহলে পৃথক হোল্ডিং চালু হবে। অর্থাৎ সেখানে দুইটি হোল্ডিং চালু হবে এবং কেউ কারও সহ-অংশীদার হিসেবে গণ্য হবে না। তাই যখনই একটি সম্পত্তি নামজারি হয়ে আলাদা হয়ে যাবে তখনই একটি হোল্ডিং সৃষ্টি হয়ে যাবে।
কেবল বিক্রয়ের ক্ষেত্রেই অগ্রক্রয়ের অধিকার জন্মায়। দান, বিনিময়, উইল ইত্যাদি মূলে হস্তান্তর হলে অগ্রক্রয়ের অধিকার সৃষ্টি হয় না। এছাড়া দলিল রেজিস্ট্রেশন হবার আগে অগ্রক্রয়ের অধিকার সৃষ্টি হয় না। দলিল রেজিস্ট্রেশনের পূর্বেই অগ্রক্রয়ের আবেদন করা হলে তা Pre-mature বলে গণ্য হবে তবে মামলা চলাকালীন অবস্থায় রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হলে ত্রুটি দূর হয়ে যাবে।
অংশিক অগ্রক্রয়: একটি বিক্রয় দলিলে একাধিক সম্পত্তি বিক্রয় হলে তার মধ্যে কোন একটি সম্পত্তি বিষয়ে অগ্রক্রয়ের আবেদন করতে বাধা নেই। তবে একটি নির্দিষ্ট জমির কিছু অংশ অগ্রক্রয়মূলে দাবি করা যাবে না। যেমন- সালাম সাহেব তার অংশের ১৫ কাঠা জমি আব্দুর রহমানের কাছে বিক্রয় করলে সালাম সাহেবের ভাই কালাম সাহেব ১৫ কাঠার মধ্যে ১০ কাঠা জমি অগ্রক্রয়ের আবেদন করতে পারবেন না। এক্ষেত্রে বিক্রিত সমুদয় জমিটিই চাইতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষি-অকৃষি উভয় প্রকার জমির ক্ষেত্রে একই নিয়ম।
কারা অগ্রক্রয়ের মামলা করতে পারবেন: কৃষি জমির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ এর ৯৬(১)এ ধারা অনুযায়ী কেবল ওয়ারিশসূত্রে সহ-অংশীদার অগ্রক্রয়ের জন্য আবেদন করতে পারবেন। ২০০৬ সালের পূর্বে এর আওতা আরও বিস্তৃত থাকলেও ২০০৬ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে নিয়ম করা হয় ওয়ারিশসূত্রে জোতের সহ-অংশীদার; এবং অগ্রক্রয়মূলে প্রাপ্ত হলে নিজ নামীয় কৃষি জমির পরিমাণ ৬০ বিঘা অতিক্রম করবে না এমন ব্যক্তি অগ্রক্রয়ের জন্য আবেদন করতে পারবেন। (রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ এর ৯০ ধারা ও ভূমি সংস্কার আইন, ২০২৩ এর ৪ ধারা একত্রে পড়ুন)।
কত দিনের মধ্যে মামলা করতে হবে: বিক্রয় সংক্রান্ত বিষয়ে সহ-অংশীদারকে নোটিশ প্রদান করা হলে উক্ত নোটিশ প্রাপ্তির তারিখ হতে ২ মাসে মধ্যে অগ্রক্রয়ের আবেদন করতে হবে। নোটিশ প্রদান না করা হলে বিক্রয়ের বিষয় জানার পর ২ মাসের মধ্যে আবেদন করতে হবে। তবে বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রেশন হওয়ার ৩ বছর পর কোন ভাবেই অগ্রক্রয়ের আবেদন করা যাবে না।
মামলা দায়ের পদ্ধতি: অগ্রক্রয়ের মামলা আরজি দাখিলের মাধ্যমে নয় বরং দরখাস্ত দাখিলের মাধ্যমে দায়ের করতে হয়। দরখাস্ত দাখিলের মাধমে দায়ের করতে হয় বলে এই প্রকারের মামলাকে Miscellaneous কেস বা সংক্ষেপে মিস কেস হিসেবে অবিহিত করা হয়। ৯৬ ধারার অধীনে অগ্রক্রয়ের দরখাস্তের সাথে দলিল অনুযায়ী বিক্রয়মূল্য, বিক্রয়মূল্যের উপরে ২৫% হারে ক্ষতিপূরণ এবং দলিল সম্পাদনের তারিখ হতে অগ্রক্রয়ের দরখাস্ত দাখিলের দিন পর্যন্ত ৮% হারে বাৎসরিক সুদ চালানযোগে ব্যাংকে জমা দিয়ে সেই চালানের কপি জমা দিতে হয়। চালানের কপি জমা ব্যতীত আদালত অগ্রক্রয়ের দরখাস্ত গ্রহণ করেন না। অগ্রক্রয়ের দরখাস্তে ওয়ারিশমূলে এবং খরিদমূলে সকল শরীক প্রজাকে অবশ্যই পক্ষভুক্ত করতে হবে। ৯৬ ধারার অধীনে অগ্রক্রয়ের মামলার ক্ষেত্রে ফিক্সড কোর্ট ফি (৩০০ টাকা) প্রদান করতে হয়।
অগ্রক্রয়ের মামলার মূল্যমান ১৫ লক্ষ টাকার মধ্যে হলে সংশ্লিষ্ট সহকারী জজ আদালতে, ১৫ লক্ষ টাকার উপরে কিন্তু ২৫ লক্ষ টাকা বা তার নীচে হলে সংশ্লিষ্ট সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে এবং ২৫ লক্ষ টাকার উপরে হলে সংশ্লিষ্ট যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে।
অকৃষি জমির ক্ষেত্রে অগ্রক্রয়
অকৃষি জমির অগ্রক্রয়ের ক্ষেত্রে অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৪৯ এর ২৪ ধারার বিধিবিধান প্রযোজ্য। অকৃষি জমি বলতে বুঝায় কৃষিকাজে ব্যবহৃত নয় এমন জমিকে। তবে সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভার আওতাভুক্ত সকল জমি অকৃষি হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়া বসত ভিটার জমি সবসময় অকৃষি জমি হিসেবে গণ্য হয়।
অকৃষি জমিতে কখন অগ্রক্রয়ের অধিকার জন্মায়: কৃষি জমির ক্ষেত্রে কখন অগ্রক্রয়ের অধিকার জন্মায় সেটি ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি। অকৃষি জমির ক্ষেত্রে কিছু ভিন্নতা ব্যতীত নিয়ম মোটামুটি একই ধরণের। অকৃষি জমির ক্ষেত্রে অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৪৯ এর ২৩ ধারা অনুযায়ী বিক্রয়ের বিষয়ে সহ-অংশীদারকে নোটিশ প্রদান করতে হয়। নোটিশ প্রাপ্তির দিন থেকে ৪ মাসের মধ্যে সহ-অংশীদারকে অগ্রক্রয়ের আবেদন করতে হবে। নোটিশ প্রদান না করা হলে বিক্রয়ের বিষয়টি অবগত হবার দিন থেকে ৪ মাসের মধ্যে আবেদন করতে হবে। অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৪৯ এর ২৪ ধারার জোত বা হোল্ডিং শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি, সেখানে ‘Land’ বা জমি শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। তাই পৃথক হোল্ডিং চালু হয়ে গেলেও অকৃষি জমির ক্ষেত্রে অগ্রক্রয়ের মামলা করার সুযোগ রয়েছে। আবুল কাশেম মোঃ কায়সার বনাম মোঃ রমজান আলী ও অন্যান্য 17 ADC (2020) 377 মামলায় উচ্চ আদালত বলেন, “২৪ ধারার অধীনে অকৃষি জমির ক্ষেত্রে নামজারি বা বাঁটোয়ারার চূড়ান্ত ডিক্রির পাশাপাশি সরেজমিন ভাগ-বাঁটোয়ারা করে সীমানা চিহ্নিত না করা পর্যন্ত জমির সহ-অংশীদারিত্ব শেষ হয় না”।
এক্ষেত্রেও বিক্রয় হলেই কেবল অগ্রক্রয়ের অধিকার জন্মায়। দান, বিনিময়, উইল ইত্যাদি মূলে হস্তান্তর হলে অগ্রক্রয়ের অধিকার সৃষ্টি হয় না। এছাড়া দলিল রেজিস্ট্রেশন হবার আগে অগ্রক্রয়ের অধিকার সৃষ্টি হয় না।
কারা অগ্রক্রয়ের মামলা করতে পারবেন: অকৃষি জমির ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-অংশীদার এবং ক্রয়সূত্রে সহ-অংশীদার মামলা করতে পারবেন। এই দুই শ্রেনি ব্যাতিত আর কেও অগ্রক্রয়ের আবেদন করতে পারবেন না। উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-অংশীদার এবং ক্রয়সূত্রে সহ-অংশীদার উভয়েই অগ্রক্রয়ের আবেদন করলে উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-অংশীদারের দরখাস্ত প্রাধান্য পাবে এবং ক্রয়সূত্রে সহ-অংশীদারের আবেদন অগ্রাহ্য হবে।
কত দিনের মধ্যে মামলা করতে হবে: বিক্রয় সংক্রান্ত বিষয়ে সহ-অংশীদারকে নোটিশ প্রদান করা হলে উক্ত নোটিশ প্রাপ্তির তারিখ হতে ৪ মাসে মধ্যে অগ্রক্রয়ের আবেদন করতে হবে। নোটিশ প্রদান না করা হলে বিক্রয়ের বিষয় জানার পর ৪ মাসের মধ্যে আবেদন করতে হবে। তবে বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রেশন হওয়ার ৩ বছর পর কোন ভাবেই অগ্রক্রয়ের আবেদন করা যাবে না।
মামলা দায়ের পদ্ধতি: কৃষি জমির মত এক্ষেত্রেও দরখাস্ত দাখিলের মাধ্যমে মামলা দায়ের করতে হয়। ২৪ ধারার অধীনে অগ্রক্রয়ের দরখাস্তের সাথে দলিল অনুযায়ী বিক্রয়মূল্য, বিক্রয়মূল্যের উপরে ৫% হারে ক্ষতিপূরণ চালানযোগে ব্যাংকে জমা দিয়ে সেই চালানের কপি জমা দিতে হয়। চালানের কপি জমা ব্যতীত আদালত অগ্রক্রয়ের দরখাস্ত গ্রহণ করেন না। ২৪ ধারার অধীনে অগ্রক্রয়ের মামলার ক্ষেত্রেও ফিক্সড কোর্ট ফি (৩০০ টাকা) প্রদান করতে হয়।
আদালত অগ্রক্রয়ের আবেদন মঞ্জুর করলে জমিটি বিক্রয়ের পরে ক্রেতা জমিতে যেসকল উন্নয়ন করেছে সেই উন্নয়ন খরচ এবং তার উপরে ৬.২৫% হারে সুদ মঞ্জুর করতে পারেন।
মুসলিম আইনে হক-সূফা বা অগ্রক্রয় বিষয়ে জানতে ভিজিট করুন https://ainjanun.com/haq-sufa-preemption-under-muslim-law/