বাংলাদেশে বসবাসরত খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত বিধি-বিধানের আদ্যোপান্ত্য
সর্বশেষ ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ০.৩০% খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী। রোমান ক্যাথলিক, ব্যাপটিস্ট ছাড়াও গারো, সাঁওতাল, ওরাওঁ, চাকমা, লুসাই, বম সহ কিছু নৃগোষ্ঠীর কিছু সংখ্যক খ্রিষ্ট ধর্মের অনুসারী রয়েছে। খ্রিষ্ট ধর্মের অনুসারীদের বিবাহ, বিবাহ- বিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার সহ ব্যক্তিগত বিষয়সমূহের জন্য রয়েছে বিশেষ নিয়ম কানুন। বাংলাদেশে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের জন্য বিবাহের ক্ষেত্রে The Christian Marriage Act, 1872, বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত বিষয়ে The Divorce Act, 1869, এবং উত্তরাধিকার নির্ণয়ের ক্ষেত্রে Succession Act, 1925 অনুসরণ করা হয়।

বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশের সকল মতের খ্রিষ্ট ধর্মের অনুসারীর জন্যই ১৮৬৯ সালের আইনটি প্রযোজ্য। পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ এর ৫ ধারার বিধান এবং উচ্চ আদালতের নজীর Pochon Rikssi Das Vs Khuku Rani Dasi [ 50 DLR (HCD) 47] এর আলোকে পারিবারিক আদালত বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত বিষয়ে সাধারণ ভাবে ধর্ম নির্বিশেষে এখতিয়ারপ্রাপ্ত হলেও যেক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে সেক্ষেত্রে সেই আইনটিই প্রযোজ্য হবে। The Divorce Act, 1869 অনুসারে খ্রিষ্টান বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত আদেশ প্রদান করতে পারে কেবল হাইকোর্ট বিভাগ এবং জেলা জজ আদালত।
স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যে কোন একজন খ্রিষ্ট ধর্মের অনুসারী হলেই বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত বিষয়ে The Divorce Act, 1869 আইনটি প্রযোজ্য হবে। তবে স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যে একজন মুসলিম হলে আদালত অত্র আইনের অধীন কোন প্রতিকার প্রদান করতে পারবে না। খ্রিষ্ট ধর্মের অনুসারী কোন নারী বা পুরুষ একপাক্ষিক বিবাহ বিচ্ছেদের ঘোষণা প্রদান করে বা পারস্পারিক সম্মতিক্রমে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন না। আদালতের ডিক্রি ব্যাতীত বাংলাদেশে খ্রিষ্টান বিবাহ বিচ্ছেদযোগ্য নয়। খ্রিষ্টান বিবাহে স্বামী বা স্ত্রী একে অপরের থেকে আলাদা হতে চাইলে উপযুক্ত কারণ সাপেক্ষে The Divorce Act, 1869 অনুযায়ী ৩ ধরণের প্রতিকার পেতে পারেন, ১। বিবাহ বিচ্ছেদ, ২। বিবাহ অকার্যকর ঘোষণা, এবং ৩। জুডিসিয়াল সেপারেশান। প্রতিটি বিষয়েই হাইকোর্ট বিভাগ এবং জেলা জজ আদালতের Concurrent Jurisdiction রয়েছে। অর্থাৎ পক্ষগণ হাইকোর্ট বিভাগ বা জেলা জজ আদালত যেকোনটিতে আবেদন করতে পারবেন।
বিবাহ বিচ্ছেদ
আদালত স্বামী বা স্ত্রীর আবেদনের প্রেক্ষিতে বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি প্রদান করতে পারেন। স্ত্রী ব্যাভিচারে লিপ্ত বা ব্যাভিচারের অপরাধ করেছেন এমন অভিযোগের ভিত্তিতে স্বামী বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি পেতে পারেন তবে সেক্ষেত্রে দরখাস্তে স্বামীকে অবশ্যই ভিত্তি রয়েছে এমন ঘটনাসমূহ সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করতে হবে এবং যে ব্যাক্তির সাথে স্ত্রী ব্যাভিচার করেছেন বলে অভিযোগ করছেন তাকে সহবিবাদী ( Co-defendant) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
একজন স্ত্রীরও বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। একজন স্ত্রী আইনে বর্ণিত কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ দেখিয়ে আদালতে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন। কারণসমূহ নিম্নরূপঃ
উক্ত নারীর স্বামী যদি-
ক) খ্রিষ্ট ধর্ম পরিত্যাগ করেন এবং অন্য নারীকে বিবাহ করেন;
খ) অজাচারের ( Incestuous Adultery) অপরাধে অপরাধী হন;
গ) ব্যাভিচারসহ অন্যের স্ত্রীকে বিবাহ ( Bigamy with adultery) করার অপরাধ করেন;
ঘ) ব্যাভিচারসহ অপর কোন নারীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার অপরাধ করেন;
ঙ) ধর্ষণ, পায়ুকাম, বা পাশবিকতা করেন;
চ) নিষ্ঠুর আচরণ এবং ব্যাভিচারে লিপ্ত থাকেন;
ছ) যৌক্তিক কোন কারণ ছাড়া ২ বছরের অধিক সময় স্ত্রীকে পরিত্যাগ করে ব্যাভিচারে লিপ্ত থাকেন।
আদালত সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হন যে, দরখাস্তকারী তার দাবী প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন এবং দরখাস্তকারীর মোকদ্দমাটি যোগসাজসী নয় তাহলে আদালত ১৬ ও ১৭ ধারার বিধান সাপেক্ষে বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি প্রদান করবেন। তবে আদালত বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি প্রদান নাও করতে পারেন যদি বিবাহ বলবৎ থাকা অবস্থায় দরখাস্তকারী নিজেই ব্যাভিচারের অপরাধে অপরাধী হন বা মোকদ্দমা দায়ের করতে যুক্তিসঙ্গত কারণ ব্যাতিত অধিক বিলম্ব করেন বা ব্যাভিচারের অভিযোগ আনয়নের পূর্বেই যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া দীর্ঘ সময় স্বামী/স্ত্রী হতে পৃথক ভাবে বসবাস করেন অথবা স্বামী/স্ত্রীর প্রতি এমন অবজ্ঞাসূচক খারাপ আচরণ করেন যার ফলে স্বামী/স্ত্রী ব্যাভিচারের দিকে ধাবিত হন।
দরখাস্তকারী তার দাবী প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলে অথবা মোকদ্দমাটি বিবাদীদের কোন একজনের সাথে যোগসাজসীমূলে আনয়ন করা হয়েছে মর্মে আদালতে প্রমাণিত হলে আদালত মোকদ্দমাটি খারিজ করে দিবেন। বিবাহ বিচ্ছেদের মোকদ্দমায় বিবাদীও উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে দরখাস্ত দায়েরের মাধ্যমে একই প্রক্রিয়ায় প্রতিকার পেতে পারেন । জেলা জজ আদালত কর্তৃক বিবাহ বিচ্ছেদের মোকদ্দমা খারিজ করা হলে, একই কারণে হাইকোর্ট বিভাগে নতুন করে মোকদ্দমা দায়ের করার ক্ষেত্রে কোন বাধা নেই। জেলা জজ আদালত বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি প্রদান করলে সেটি হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক অনুমদিত (Confirmed) হতে হবে। তিন বা তার অধিক বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে অনুমোদনের শুনানী অনুষ্ঠিত হলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। দুই জন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে শুনানী হলে এবং বিভক্ত সিদ্ধান্ত হলে ক্ষেত্রে সিনিয়র বিচারপতির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হিসেবে গৃহীত হবে।
অনুমোদন (Confirmation) ব্যাতিত হাইকোর্ট বিভাগ কোন বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি প্রদান করলে তা তাৎক্ষনিক ভাবে কার্যকর হবে না বরং সেটি ডিক্রি নিশি ( Decree Nisi) হিসেবে গণ্য হবে এবং ৬ মাসের পূর্বে সেটিকে চূড়ান্ত (Absolute) করা যাবে না। কেন বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রিটি চূড়ান্ত করা হবে না, বিবাদী এই সময়ের মধ্যে সে মর্মে ব্যাখ্যা প্রদানের সুযোগ পাবেন।
বিবাহ অকার্যকর ঘোষণা ( Decree of Nullity)
স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যে যে কেউ জেলা জজ আদালতে বা হাইকোর্ট বিভাগে দরখাস্ত দাখিল করে বিবাহ অকার্যকর মর্মে ঘোষণা চাইতে পারেন। কতিপয় কারণ ও প্রেক্ষাপটে একজন স্বামী বা স্ত্রী বিবাহ অকার্যকর মর্মে ঘোষণামূলক ডিক্রি পেতে পারেন। কারণগুলো হলো-
ক) বিবাহের সময় এবং মোকদ্দমা দায়েরের সময় স্বামী/স্ত্রী শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে অক্ষম ছিলেন;
খ) স্বামী বা স্ত্রী যদি বিবাহের ক্ষেত্রে রক্ত বা আত্মীয়তার সম্পর্কে নিষিদ্ধ পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত হন;
গ) বিবাহের সময় স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে কোন একজন উন্মাদ বা নির্বোধ প্রকৃতির হলে;
ঘ) বিবাহের সময় যদি স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে কারও পূর্বের স্ত্রী/স্বামী জীবিত থাকেন এবং তার সাথে বিবাহও বলবৎ থাকে।
বিবাহের সময় স্বামী বা স্ত্রী কোন একজনের সম্মতি জোরপূর্বক বা প্রতারণা করে আদায় করা হলেও বিবাহ অকার্যকর ঘোষণা করে ডিক্রি প্রদান করা যায়, তবে এক্ষেত্রে কেবল হাইকোর্ট বিভাগ ডিক্রি প্রদান করতে পারেন। জেলা জজ আদালত বিবাহ অকার্যকর মর্মে কোন ঘোষণা প্রদান করলে তা কার্যকর হতে হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
জুডিসিয়াল সেপারেশন ( Judicial Separation)
ব্যাভিচার, নিষ্ঠুরতা বা যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ ছাড়া ২ বছরের অধিক সময় নিখোঁজ থাকার গ্রাউন্ডে স্বামী বা স্ত্রী হাইকোর্ট বিভাগ বা জেলা জজ আদালতে আবেদন করে জুডিসিয়াল সেপারেশনের ডিক্রি পেতে পারেন। এক্ষেত্রে এমন আদেশের ফলাফল হবে A mensa et toro অর্থাৎ স্বামী স্ত্রী সম্পর্ক বিদ্যমান থাকলেও একসাথে বসবাস করতে পারবেন না। জুডিসিয়াল সেপারেশনের আদেশ হবার পর এবং আদেশটি যতদিন বলবৎ থাকে মনে করতে হবে মেয়েটি অবিবাহিত এবং সেভাবেই তার সম্পত্তি বিভাগ বণ্টন হবে। জুডিসিয়াল সেপারেশনের পরে স্বামী তার স্ত্রীর কোন দায়ে দায়ী হবেন না।
বিবাহ বিচ্ছেদ কোন সমাজে কোন সম্প্রদায়েই কাঙ্ক্ষিত বিষয় নয়। খ্রিষ্টান বিবাহ বিচ্ছেদ হলে পুনর্বিবাহের নিয়ম রয়েছে।
he Special Marriage Act, 1872 অনুযায়ী বিবাহ হয়েছে এমন নারী বা পুরুষ যদি কেউ বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে চান তাহলে ‘খ্রিষ্টান বিবাহ বিচ্ছেদ’ সংক্রান্ত এই বিধি বিধানগুলো প্রযোজ্য হবে। বিশেষ বিবাহ আইন বিষয়ে কিছুটা ধারণা নিতে ভিজিট করুন-
https://ainjanun.com/hindu-muslim-marriage/