পিতা মারা গেলে নাবালক সন্তানের সম্পত্তি হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া জানুন ধাপে ধাপে।

মিঃ হাসেম তার শিশুপুত্র এবং স্ত্রী কে রেখে মারা যান। শিশুপুত্রের নামে কিছু জমি রয়েছে অথবা পিতার মৃত্যুর পর ওয়ারিশসূত্রে কিছু সম্পত্তি পেয়েছে। স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রী তার সন্তানকে নিয়ে আর্থিক কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। শিশুপুত্রের লেখাপড়া ও চিকিৎসার জন্য টাকা-পয়সা প্রয়োজন। বিধবা স্ত্রী ভাবছেন পুত্রের কিছু জমি বিক্রয় করলে পড়াশুনা ও চিকিৎসাটা ভালো ভাবে করানো যেতো। কিন্তু নাবালক পুত্র কি জমি বিক্রয় করতে পারে বা পুত্রের পক্ষে তিনি কি জমি বিক্রয় করতে পারবেন? – এই প্রশ্ন কিন্তু শুধু এই বিধবা স্ত্রীর নয়। আমাদের অনেকের মধ্যেই এই প্রশ্নটি রয়েছে। আজকে আমরা এই বিষয়ে বিস্তারিত জানবো।
একজন নাবালক তার সম্পত্তি বিক্রয় করতে পারেন না। নাবালকের সম্পত্তি পিতা ব্যতীত অন্য কেও হস্তান্তর করে চাইলে আদালতের অনুমতি প্রয়োজন হয়। পিতা সন্তানের ন্যাচারাল গার্ডিয়ান। ১২ ডিএলআর, ৪৩৩ রিপোর্টেড একটি মামলায় উচ্চ আদালত বলেছেন, নাবালক সন্তানের ন্যাচারাল গার্ডিয়ান হিসেবে পিতা আদালতের অনুমতি ছাড়াই সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন। অর্থাৎ আদালতের অনুমতি ছাড়া মা তার নাবালক সন্তানের সম্পত্তি বিক্রয় বা হস্তান্তর করতে পারেন না। আর এই ক্ষেত্রে এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত হলো সংশ্লিষ্ট পারিবারিক আদালত। বর্তমানে প্রত্যেক জেলাতেই পৃথক পারিবারিক আদালত রয়েছে।
নাবালকের জমি বিক্রয় করতে হলে প্রথমেই পারিবারিক আদালতে নাবালকের শরীর ও সম্পত্তির অভিভাবক নিযুক্ত হওয়ার প্রার্থনায় ‘ অভিভাবকত্ব’ বা Guardianship মোকদ্দমা দায়ের করতে হবে। ‘অভিভাবক’ নিযুক্ত হবার দরখাস্তে অবশ্যই নাবালকের সম্পত্তির বিবরণ শুদ্ধ ও সঠিক ভাবে দিতে হবে। নাবালকের কোন বড় ভাই, দাদা বা চাচা জীবিত থাকলে তাকে এই মামলায় প্রতিপক্ষ করতে হবে। সাধারণত এসব মামলায় প্রতিপক্ষের আপত্তি থাকে না তাই সহজেই আপোস হয়ে যায়। আপোসনামা বা সোলেনামা দাখিল করা হলে আদালত সংক্ষিপ্ত জবানবন্দী গ্রহণ করেন এবং দরখাস্তকারীকে নাবালকের শরীর ও সম্পত্তির অভিভাবক নিযুক্ত করেন। আদালত একই সাথে নিযুক্ত অভিভাবককে প্রতি বছর নাবালকের সম্পদের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণী আদালতে দাখিল করার নির্দেশ প্রদান করেন।
নাবালকের অভিভাবক নিযুক্তি হলো এই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ। এরপর নাবালকের যেই সম্পত্তি নিযুক্ত অভিভাবক বিক্রয় করতে চান সেই জমির বিবরণ সহ বিক্রয়ের অনুমতি প্রার্থনায় একই আদালতে আবেদন করতে হবে। আদালত উক্ত আবেদন মঞ্জুর করলে একটি লিখিত আদেশ দিবেন এবং আদালত থেকে একটি সার্টিফিকেট ইস্যু করবেন।
আদালতের অনুমতি পাওয়ার পর সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল প্রস্তুত করতে হবে এবং তা সম্পাদন ও রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। রেজিস্ট্রেশনের সময় অবশ্যই আদালতের পারমিশনের কাগজপত্র উপস্থাপন করতে হবে। আরেকটি বিষয়, যখন দলিটি ড্রাফট করা হবে তখন দলিলেও আদালতের পারমিশন নেয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা প্রয়োজন। এটি ভবিষ্যতে ক্রেতার জন্য একটি সুরক্ষা কবচ হতে পারে।
আদালতের দ্বারস্থ হতে গেলে আইনজীবী নিয়োগ করতে হয়, মোকদ্দমা পরিচালনা ব্যয় হয় যা অনেকের পক্ষে বহন করা কঠিন হয়ে যায়। আপনি যদি আর্থিক ভাবে অস্বচ্ছল হন তাহলে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সহযোগিতা নিতে পারেন। প্রত্যেক জেলায় জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনে বা তার সন্নিকটেই জেলা লিগ্যাল এইড অফিস অবস্থিত। তারা আপনাকে প্রয়োজনীয় আইনগত পরামর্শ প্রদান করবেন এবং প্রয়োজনে আপনার মামলার সমস্ত ব্যয়ভার বহন করবেন।
বিঃ দ্রঃ নাবালকের বড় ভাই/বোন, দাদা বা চাচাও অভিভাবক নিযুক্ত হবার জন্য আবেদন করতে পারেন। আদালত যাকে উপযুক্ত মনে করেন তাকে অভিভাবক নিযুক্ত করতে পারেন।
আইন জানুন, আইন মানুন, সুন্দর ও সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করুন।
লিগ্যাল এইড বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন…
আচ্ছা যদি বিধবা মা দ্বিতীয় বিয়ে করতো চান এবং সকল সম্পত্তি মানে নাবালক সন্তানদের সম্পত্তি বিক্রি করে ব্যাংকে উঠতে চান।তাহলে কি তাকে বাধা দেওয়া বা তার পাওয়ার খর্ব বা কেড়ে নেওয়ার কোনো উপায় কি বেচে নেই তার নাবালক সন্তানদের জন্য?
কেবল অভিভাবক নিযুক্ত হলেই নাবালকের সম্পত্তি বিক্রয় করা যায় না, বিক্রয়ের জন্য আদালতের পূর্বানুমতি লাগে। প্রত্যেকটি সম্পত্তি বিক্রয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট ভাবে অনুমতি প্রয়োজন হয়। যদি অপ্রয়োজনীয় ভাবে নাবালকের সম্পত্তি বিক্রয় করতে উদ্যত হন, তাহলে নাবালক উক্ত বিষয়টি আদালতের নজরে আনলে, আদালত ন্যয় বিচারের স্বার্থে উক্ত অনুমতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারেন।