দলিলে দাগ বা খতিয়ান নাম্বার ভুল হয়েছে? দলিলদাতা সংশোধন করে দিচ্ছেন না? আপনার করণীয় কী?

আক্কাস সাহেব সাফ কবলা দলিলমূলে আব্বাস মিয়ার কাছ থেকে এক বিঘা জমি কিনেছিলেন। কেনার বেশ কিছুদিন পর ভূমি অফিসে খারিজ (মিউটেশন) করতে গিয়ে দেখা গেল, দলিলে সাবেক দাগ নম্বর ঠিক থাকলেও হাল দাগ নম্বর ভুল হয়েছে। তবে খতিয়ান নম্বর সাবেক ও হাল—দুটোই ঠিক আছে।
সমস্যা হলো, আব্বাস মিয়া (দলিলদাতা) ততদিনে মারা গেছেন। আক্কাস সাহেব আব্বাস মিয়ার ছেলে-মেয়েদেরকে বিষয়টি জানালে তারা বলেন, “আমরা এই বিষয়ে কিছু করতে পারব না, আপনি যা করার করুন।”
এমন ঘটনা আমাদের সমাজে প্রায়শই দেখা যায়। দলিলে ভুল হলে একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে তা সংশোধন করবেন? আইনের সাহায্য নিয়ে দলিল সংশোধনের প্রক্রিয়া কী, সে বিষয়েই বিস্তারিত জানবো আজকের এই লেখায়।
দলিল কখন সংশোধন করা যায়?
একটি দলিলে নানা রকম ভুল হতে পারে— খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ, মৌজার নাম ইত্যাদি। তবে দাগ বা খতিয়ান নম্বরের ভুল সচরাচর বেশি দেখা যায়।
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ (The Specific Relief Act, 1877)-এর ধারা ৩১ অনুযায়ী মূলত তিনটি ক্ষেত্রে দলিল সংশোধনের জন্য আদালতের কাছে যাওয়া যায়:
১. প্রতারণা (Fraud),
২. পক্ষগণের পারস্পরিক ভুল (Mutual Mistake)
৩. প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন না হলে (Not Truly Expressing Intention)
১. প্রতারণা (Fraud)
দলিল দাতা বা গ্রহিতার মধ্যে কোন একটি পক্ষ যদি প্রতারণার আশ্রয় নেয় তাহলে যে পক্ষ প্রতারণার শিকার হয়েছেন তিনি দলিলটি সংশোধন চাইতে পারেন। ধরুন, মিস্টার রফিকের দুইটি জমি আছে—হাল ২০১ দাগে ১০ শতক মূল্যবান জমি এবং হাল ২০৭ দাগে ১০ শতক কম মূল্যবান জমি। মিস্টার রফিক ২০১ দাগের জমি বিক্রির কথা বলে দলিল লেখকের সঙ্গে যোগসাজশ করে মিস্টার শফিকের কাছে কম মূল্যের ২০৭ দাগের জমি দলিল করে দিলেন। পরে মিস্টার শফিক বুঝতে পারলেন যে তিনি প্রতারিত হয়েছেন। এমতাবস্থায়, প্রতারণার শিকার হওয়া মিস্টার শফিক আইনগতভাবে দলিলটি সংশোধন করার জন্য মামলা করতে পারবেন।
২. পক্ষগণের পারস্পরিক ভুল (Mutual Mistake)
দলিল দাতা ও দলিল গ্রহীতা উভয়ই যদি অনিচ্ছাকৃত ভাবে কোন ভুল করে থাকেন, তাহলে যেকোন পক্ষই দলিলটি সংশোধন চাইতে পারেন। যেমন উপরের উদাহরণের ক্ষেত্রে, যদি মিস্টার রফিক ও মিস্টার শফিক কেউই ইচ্ছাকৃতভাবে কাজটি না করতেন এবং উভয়েই সরল বিশ্বাসে ভুলটি করতেন, তাহলে যেকোনো পক্ষই দলিল সংশোধনের জন্য আবেদন করতে পারত।
৩. প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন না হলে
দলিলদাতা এবং গ্রহীতা যে অভিপ্রায় বা ইচ্ছায় দলিলটি সম্পাদন করছেন, সেই ইচ্ছা যদি দলিলে যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হয় বা ইচ্ছার বাইরে অন্য কিছু দলিলে চলে আসে, তবে দলিলটি সংশোধন চাওয়া যাবে।
কীভাবে দলিল সংশোধন করবেন? (মামলার প্রক্রিয়া)
দলিলে ভুল রয়েছে—এই বিষয়টি বুঝতে পারার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উপযুক্ত দেওয়ানী আদালতে মামলা দায়ের করে দলিল সংশোধন করে নিতে হবে।
১. সময়সীমা (তামাদি আইন)
তামাদি আইন, ১৯০৮-এর প্রথম তফশিলের ৯৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ভুলের বিষয়টি জানতে পারার তারিখ থেকে ৩ (তিন) বছরের মধ্যে দলিল সংশোধনের মামলা করতে হয়।
২. মামলার মূল্যমান ও আদালত নির্ধারণ
মামলার মূল্যমান বা ‘তায়দাদ’ নির্ধারণের ক্ষেত্রে দলিলের লিখিত মূল্যকেই (বাজারমূল্য নয়) বিবেচনা করতে হয়। এই মূল্যমানের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে:
- ১৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত: সহকারী জজ আদালত
- ১৫ লক্ষ টাকার বেশি থেকে ২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত: সিনিয়র সহকারী জজ আদালত
- ২৫ লক্ষ টাকার উপরে: যুগ্ম জেলা জজ আদালত
৩. মামলা দায়ের
একজন অভিজ্ঞ সিভিল ল‘ইয়ারের শরণাপন্ন হয়ে আরজি (মামলার আবেদন) তৈরি করে সংশ্লিষ্ট আদালতে উপস্থাপন করতে হবে।
- কোর্ট ফি: মামলা দায়েরের সময় মূল্যানুপাতিক কোর্ট ফি বা এডভেলরেম কোর্ট ফি দিতে হয়। বর্তমানে দলিল সংশোধনের মামলায় ২% হারে কোর্ট ফি প্রদান করতে হয়।
- প্রয়োজনীয় কাগজপত্র: যে দলিলটি সংশোধন চাওয়া হচ্ছে, তার মূল কপি বা জাবেদা কপি সহ মামলা প্রমাণে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে হবে।
৪. মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে করণীয়
যদি আপনি যার বিরুদ্ধে মামলা করতে চাচ্ছেন (যেমন আক্কাস সাহেবের উদাহরণে মৃত আব্বাস মিয়া), তিনি যদি মারা যান, তাহলে তাঁর ওয়ারিশ বা বৈধ প্রতিনিধি (Legal Representative)-কে এই মামলায় পক্ষভুক্ত করতে হবে।
৫. আদালতের রায় ও সংশোধন
সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতের নিকট দলিলটি সংশোধনযোগ্য মর্মে প্রতীয়মান হলে, আদালত দলিল সংশোধনের পক্ষে রায় (Judgment) ও ডিক্রি (Decree) দিবেন।
এই রায়-ডিক্রিতে আদালত সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার অফিসকে নির্দেশ প্রদান করবেন, যাতে সেই দলিলের সংশ্লিষ্ট ভলিয়ম বহিতে সংশোধন বিষয়ে প্রয়োজনীয় নোট প্রদান করা হয়। এর মাধ্যমে আপনার দলিলটি আইনগতভাবে সংশোধিত হয়ে যায় এবং সাব-রেজিস্ট্রার অফিস সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
এই প্রক্রিয়ায় আইনি পথে হেঁটে আপনি আপনার দলিলে থাকা ভুল সংশোধন করে নিতে পারবেন এবং আপনার জমির মালিকানা নিশ্চিত করতে পারবেন।
আপনি যদি আর্থিক ভাবে সচ্ছল না হন তাহলে আপনার জন্য মামলার ব্যয়ভার বহন করা কঠিন হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সহযোগিতা গ্রহণ করতে পারেন। গরীব, দুঃস্থ ও অসহায় নারী, পুরুষ ও শিশুর মামলার ব্যয়ভার বাংলাদেশ সরকার বহন করে। প্রত্যেক জেলার জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবন বা তার সন্নিকটেই জেলা লিগ্যাল এইড অফিস রয়েছে। বিচারকগণের মধ্য হতেই জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার পদে পদায়ন করা হয়। তাই তিনি আইন বিষয়ে অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও দক্ষ হয়ে থাকেন। আপনার পক্ষে আইনজীবী নিযুক্ত করা থেকে শুরু করে যাবতীয় আইনানুগ সেবা দিতে তিনি বদ্ধপরিকর। জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার একটি হেল্প লাইন রয়েছে। আপনারা সেই নাম্বারে কল করেও আইনগত সহায়তা পেতে পারেন। হেল্প লাইন নাম্বার- ১৬৪৩০ ।
লিগ্যাল এইড বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে এই এই লিঙ্কে ভিজিট করতে পারেন। https://ainjanun.com/legalaid-binamulle-aini-sheba/