“দলিল যার জমি তার” – কথাটা কতটুকু সত্য? আইনি বিশ্লেষণ ও আপনার করণীয়
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি কথা খুব বেশি প্রচলিত – “দলিল যার, জমি তার”। অর্থাৎ, যার কাছে জমির দলিল রয়েছে, তিনিই সেই জমির মালিক। আপাতদৃষ্টিতে কথাটা সঠিক মনে হলেও, বাস্তবতা এত সরল নয়। শুধু দলিল থাকলেই হবে না, বরং দলিলটি আইনের দৃষ্টিতে বৈধ এবং কার্যকর দলিল হতে হবে।
নিচে কয়েকটি বাস্তবসম্মত ঘটনার আলোকে বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

প্রতীকী ছবি ।
ঘটনা ১:
রফিক উদ্দিন তার বাড়ির পুরনো ট্রাঙ্ক থেকে কিছু দলিল দস্তাবেজ খুঁজে পেলেন। এর মধ্যে একটি দলিলের মাধ্যমে তিনি জানতে পারলেন যে, তার বাবা প্রায় ৩০ বছর আগে একটি জমি কিনেছিলেন। জমিটির খোঁজ নিতে গিয়ে রফিক জানতে পারলেন যে, এটি দীর্ঘ দিন যাবৎ অন্য এক ব্যক্তির দখলে রয়েছে। রফিক পূর্বে কখনো এই জমি তার বাবাকে ভোগ দখল করতে দেখেননি বা শোনেননি।
ঘটনা ২:
ফরিদ তার বাড়িতে একটি পুরনো দলিল খুঁজে পেলেন। সেই দলিলে উল্লেখ আছে যে, তার দাদা তাদের ১ বিঘা জমির সাথে করিম শেখের ১৫ কাঠা জমি বিনিময় করেছেন। ফরিদ দেখলেন যে, তার দাদা যে জমি বিনিময় করেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে, সেই জমিটি আসলে তাদের দখলেই আছে। অন্যদিকে, করিম শেখের ১৫ কাঠা জমি তার ছেলে-মেয়েরা ভোগ দখল করছে। করিম শেখের সেই ১৫ কাঠা জমির পাশ দিয়ে বর্তমানে মহাসড়ক তৈরি হওয়ায় তার দাম বহু গুণ বেড়েছে। ফরিদের এখন মনে হচ্ছে, যেহেতু তার দাদা ও করিম শেখের মধ্যে বিনিময় হয়েছে, তাই ১৫ কাঠার জমির মালিক তারাই।
ঘটনা ৩:
শরফুদ্দিনের বাবার ৩০ শতক জমি ছিল। শরফুদ্দিনেরা তিন ভাই, তাই প্রত্যেকের ভাগে ১০ শতক করে জমি পাওয়ার কথা। কিন্তু শরফুদ্দিন বারেক মোল্লার কাছে ৭ শতক, তার স্ত্রীর বরাবর ৫ শতক হেবা (দান) এবং রফিক মোল্লার কাছে ৫ শতক জমি বিক্রি করেছেন। অর্থাৎ, শরফুদ্দিন নিজে পেয়েছেন মোট ১০ শতক, আর হস্তান্তর করেছেন ১৭ শতক! (১৯৮৪ সালের পূর্বে এমন ঘটনা প্রায়শই ঘটতো)।
এই তিনটি ঘটনার আলোকে আমরা আলোচনা করব, কেবল দলিল থাকলেই মালিকানা অর্জন করা যাবে কি না।
কেস স্টাডি ও আইনি ব্যাখ্যা
কেস স্টাডি- ঘটনা ১: দখলহীন বিক্রয় দলিল
সহজ ভাষায় বিক্রয় বলতে বোঝায় মূল্যের বিনিময়ে স্বত্ব ও দখল হস্তান্তর। কোনো দলিলের অনুবলে দখল হস্তান্তরিত না হলে, সেই হস্তান্তরটি পরিপূর্ণ হয় না। কিছু কিছু হস্তান্তরের ক্ষেত্রে প্রকৃত দখল না দিলেও চলে, যেমন স্বামী যদি তার স্ত্রীকে দান করেন, সেক্ষেত্রে প্রকৃত দখল না দিলেও চলে। এমন কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সব ক্ষেত্রেই জমির দখল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঘটনা-১ এ যা ঘটেছে, তা হলো একটি বিক্রয় কবলা দলিল সম্পাদিত হয়েছে, হয়তো যথাযথভাবে রেজিস্ট্রেশনও হয়েছে, কিন্তু ক্রেতা কোনো দখল পাননি। ক্রেতার করণীয় ছিল ক্রয়ের পরপরই জমিটির দখল নেওয়া। যদি কেউ দখল গ্রহণ করতে বাধা দিতো, তাহলে ক্রয়ের তারিখ থেকে ১২ বছরের মধ্যে আদালতে মামলা করে দখল বুঝে নিতে পারতেন। ক্রেতা বা তার ওয়ারিশরা যেহেতু জমিটির দখল পাননি বা ১২ বছরের মধ্যে মামলা করেননি, তাই দলিলটি কার্যকর (Acted upon) হয়নি। এমতাবস্থায় রফিক উদ্দিনের কাছে দলিল থাকলেও তিনি জমিটি পাবেন না।
কেস স্টাডি- ঘটনা ২: অকার্যকর বিনিময় দলিল
এখানেও আমরা দেখতে পাচ্ছি, বিনিময় দলিলটি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, যা বাস্তবে কার্যকর হয়নি। যেহেতু প্রকৃত অর্থে ফরিদের দাদা বিনিময়কৃত জমির দখল পাননি এবং নিজ জমির দখলও ছাড়েননি, তাই এই দলিলটিও অকার্যকর দলিল। ফরিদ এখন করিম শেখের সেই ১৫ কাঠা জমি দাবি করতে পারবেন না।
কেস স্টাডি- ঘটনা ৩: প্রাপ্যতার অধিক হস্তান্তর
শরফুদ্দিন তার প্রাপ্ত অংশের (১০ শতক) থেকে বেশি জমি হস্তান্তর করেছেন।
- বারেকের কাছে ৭ শতক বিক্রয়: অন্য কোনো ত্রুটি না থাকলে, এই দলিলটি বৈধ হবে।
- স্ত্রীর বরাবর ৫ শতক দান: শরফুদ্দিনের জমিই অবশিষ্ট ছিল ৩ শতক। যেহেতু তিনি ৩ শতকের বেশি জমি স্ত্রীকে দান করতে পারবেন না, তাই অন্য কোনো ত্রুটি না থাকলে স্ত্রীর নামে ৩ শতক জমি বৈধ হবে, পুরো ৫ শতক তিনি পাবেন না।
- রফিক মোল্লার কাছে ৫ শতক বিক্রয়: শরফুদ্দিনের কোনো জমি অবশিষ্ট না থাকার পরেও তিনি রফিক মোল্লার কাছে ৫ শতক বিক্রি করেছেন। এটি আইনসম্মত হয়নি। তাই রফিক মোল্লা এই জমি পাবেন না। এক্ষেত্রে রফিক মোল্লার জন্য একাধিক ফৌজদারি ও দেওয়ানি প্রতিকার রয়েছে। রফিক মোল্লা শরফুদ্দিনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা (যেমন- দন্ডবিধি ৪২০ ধারা অনুযায়ী প্রতারণার মামলা) বা দেওয়ানী মামলা করে ক্রয়মূল্য ফেরত পেতে পারেন।
শেষ কথা: দলিল এবং কার্যকর দখল – দুটোই জরুরি
উপরে বর্ণিত ঘটনা ছাড়াও আমাদের সমাজে এমন নানাবিধ ঘটনা ঘটে থাকে। প্রতিটি ঘটনায় একেক রকম আইনি দিক থাকে। তাই সব ঘটনাকে এক পাল্লায় মাপলে চলবে না। বিশেষ প্রেক্ষাপটে বিশেষ পরামর্শের প্রয়োজন হয়ে থাকে।
উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, কেবল দলিল থাকলেই চলবে না; বরং বৈধ এবং কার্যকর দলিল যার, মালিকানা তারই।
আপনি যদি কোনো আইনি জটিলতায় পড়েন, তাহলে অভিজ্ঞ আইনজীবীর শরণাপন্ন হতে পারেন। আপনি যদি আর্থিকভাবে অসচ্ছল হন, তাহলে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সহযোগিতা নিতে পারেন। জেলা লিগ্যাল এইডের সহযোগিতা কীভাবে নিবেন, সে বিষয়ে আমাদের ব্লগের আরেকটি লেখায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে, চাইলে সেটি পড়তে পারেন।