হক সূফা: মুসলিম আইন অনুযায়ী অগ্রক্রয়ের অধিকার

ইসলামী শরিয়া আইনে অগ্রক্রয়ের অধিকার স্বীকৃত। এই অধিকারকে বলা হয় ‘হক সুফা’ বা ‘হক সাফা’ (Haq Sufa)। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ এর ৯৬ (১৭) ধারা অনুযায়ী মুসলিম আইনের অধীনে অগ্রক্রয়ের অধিকারকে সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে। মুসলিম আইনে হক সূফার অধিকারের বিস্তৃতি ব্যপক। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ এর ৯৬ ধারা এবং অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৪৯ এর ২৪ ধারায় অগ্রক্রয়ের অধিকারকে অনেক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। তাই অনেকেই মুসলিম আইনের অধীনে ‘হক সূফা’ মামলা করতে বেশী আগ্রহী হচ্ছে। আজকের এই লেখায় আমরা হক সূফা বিষয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করবো।

কারা হক-সূফা দাবী করতে পারেন: মুসলিম আইনে তিন শ্রেণির মানুষ হক-সূফার জন্য আবেদন করতে পারে,  যথা-

ক) শাফি-ই-শরিক

খ) শাফি-ই-খালিত

গ) শাফি-ই-জার

শাফি-ই-শরিক বলতে বুঝায় অবিভক্ত সম্পত্তির সহ-অংশীদার। এই সহ-অংশীদারিত্ব উত্তরাধিকার বা ক্রয়সূত্রে সৃষ্টি হতে পারে। যৌথ সম্পত্তি পৃথক হয়ে গেলে বা প্রত্যেক অংশীদারের অংশ সীমানা দ্বারা সুনির্দিষ্ট ভাবে চিহ্নিত হলে এবং যাতায়াতের পৃথক রাস্তাও সুনির্দিষ্ট থাকলে শাফি-ই-শরিক হিসেবে হক-সূফার অধিকার বিদ্যমান থাকে না।

শাফি-ই-শরিক না থাকলে শাফি-ই-খালিত হক-সূফার দাবি করতে পারেন। বিক্রিত নালিশী জমিতে রাস্তা বা পানি নিষ্কাশনের অধিকারসম্পন্ন ব্যক্তিই হলেন শাফি-ই-খালিত। শাফি-ই-শরিক ও শাফি-ই-খালিত পাওয়া না গেলে হক-সূফার অধিকার শাফি-ই-জারের উপরে বর্তায়। বিক্রিত নালিশী জমির সংলগ্ন স্থাবর সম্পত্তির মালিকে শাফি-ই-জার বলা হয়। অর্থাৎ বিক্রিত জমির লাগোয়া পার্শ্ববর্তী জমির মালিকই হলেন শাফি-ই-জার। এই তিন শ্রেণির ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কেউ হক সূফার আবেদন করতে পারেন না।

অমুসলিমদের ক্ষেত্রে হক সূফা: হক সূফা মুসলমানদের ব্যক্তিগত আইন দ্বারা পরিচালিত একটি বিষয়। তাই এক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতা এবং অগ্রক্রয়কারীকে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে। তবে ক্রেতার ক্ষেত্রে দুটি ব্যতিক্রম রয়েছে। ব্যতিক্রম দুটি হলো-

  • যেসকল হিন্দু বিহার, সিলেট, বা গুজরাটের কোন কোন অংশ যেমন- সুরাট, ব্রচ, গোধরা এলাকার বাসিন্দা এবং যাদের মধ্যে অগ্রক্রয়ের বিষয়টি স্থানীয় রীতি হিসেবে বিদ্যমান;
  • চুক্তির মাধ্যমে অগ্রক্রয়ের অধিকার সৃষ্টি হলে।

 ‘হক-সূফা’ কৃষি-অকৃষি উভয় প্রকারের জমির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এই অধিকার কেবল বিক্রয়ের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। হেবা ঘোষণা, বিনিময়, উইল ইত্যাদিমূলে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ‘হক-সূফা’ প্রযোজ্য নয়।

হক-সূফা দাবি করার প্রক্রিয়া: বিক্রয়ের বিষয়ে জানার সাথে সাথে কোন বিলম্ব ছাড়াই  জমিটি ক্রয়ের আগ্রহ প্রকাশ করতে হবে এবং ঘোষণা দিতে হবে। জমিটি ক্রয়ের আগ্রহ প্রকাশ করে এই ঘোষণা দেয়াকে ‘তলব-ই-মৌসিবত’ বলা হয়। ‘তলব-ই-মৌসিবত’ আদালতে সাক্ষ্য প্রদানের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। ‘তলব-ই-মৌসিবত’ এর সময় বিলম্ব হলে হক সূফার অধিকার বিনষ্ট হতে পারে। বিক্রয় সম্পন্ন হবার পরপরই ‘তলব-ই-মৌসিবত’ পেশ করতে হবে। বিক্রয়টি সম্পন্ন হবার পূর্বেই ‘তলব-ই-মৌসিবত’ পেশ করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।

‘তলব-ই-মৌসিবত’ এর সময় বিক্রয়মূল্য সাথে নিয়ে জমি দাবি করার প্রয়োজন নেই। এ সময়ে সাক্ষীদের উপস্থিতিও আবশ্যক নয়। হক সূফা দাবিকারী ব্যক্তি জমিটি কিনতে আগ্রহী এবং প্রস্তুত মর্মে ঘোষণা করাই যথেষ্ট।

‘তলব-ই-মৌসিবত’ কে বলা হয় প্রথম দাবী। দ্বিতীয় দাবিকে বলা হয় ‘তলব-ই-ইশাদ’। ‘তলব-ই-মৌসিবত’ সম্পন্ন হবার পর ‘তলব-ই-ইশাদ’ সম্পন্ন করতে হয়। কমপক্ষে ২ জন সাক্ষীর উপস্থিতিতে ক্রেতা/বিক্রেতার সামনে বা নালিশী জমিতে দাড়িয়ে ‘তলব-ই-ইশাদ’ পেশ করতে হয়।

‘তলব-ই-মৌসিবত’ এবং ‘তলব-ই-ইশাদ’ এর সময় হক সূফা দাবিকারীকে স্বশরীরে উপস্থিত থাকার আবশ্যকতা নেই। উপযুক্ত প্রতিনিধি ‘তলব-ই-মৌসিবত’ এবং ‘তলব-ই-ইশাদ’ সম্পন্ন করলেই যথেষ্ট হবে।

মামলা দায়ের পদ্ধতি: ‘হক সূফা’ মামলা উপযুক্ত দেওয়ানী আদালতে আরজি দাখিলের মাধ্যমে দায়ের করতে হয়। মামলার মূল্যমান ১৫ লক্ষ টাকার মধ্যে হলে সংশ্লিষ্ট সহকারী জজ আদালতে, ১৫ লক্ষ টাকার উপরে কিন্তু ২৫ লক্ষ টাকা বা তার নীচে হলে সংশ্লিষ্ট সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে এবং ২৫ লক্ষ টাকার উপরে হলে সংশ্লিষ্ট যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে।

‘হক-সূফা’ মামলায় আরজিতে উল্লিখিত মামলার মূল্যমানের উপরে এডভেলরেম কোর্ট ফি ( ২% হারে মূল্যানুপাতিক) প্রদান করতে হয়। জমির মূল্যমান ১০ লক্ষ্য টাকা হলে ২% হারে ২০,০০০ টাকা কোর্ট ফি দিতে হবে । হক সূফার ক্ষেত্রে চালানযোগে বিক্রয়মূল্য জমা প্রদান করার প্রয়োজন নেই। তামাদি আইনের প্রথম তপশীলের ১০ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ক্রেতা নালিশী জমির প্রত্যক্ষ দখল প্রাপ্তির তারিখ হতে ১ বছরের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হবে।

মুসলিম আইনে ‘হক-সূফা’ মামলা করার সুবিধা: রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ এর ৯৬ ধারা অনুযায়ী কৃষি জমির ক্ষেত্রে কেবল ওয়ারিশসূত্র সহ-অংশীদার মামলা করেতে পারেন,  অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৪৯ এর ২৪ ধারা অনুযায়ী অকৃষি জমির ক্ষেত্রে কেবল উত্তরাধিকার সূত্রে সহ-অংশীদার ও ক্রয়সূত্রে সহ-অংশীদার মামলা করতে পারেন। আর মুসলিম আইনে ‘হক-সূফা’ মামলা সহ অংশীদার ছাড়াও পথ ও পানির অধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং পার্শ্ববর্তী সংলগ্ন জমির মালিকও মামলা করতে পারেন।

 ৯৬ ও ২৪ ধারা অনুযায়ী দরখাস্ত দায়েরের সময় চালানযোগে বিক্রয়মূল্য ও নির্দিষ্ট হারে ক্ষতিপূরণ জমা প্রদান করতে হয় কিন্তু ‘হক-সূফা’ মামলার ক্ষেত্রে চালানযোগে কোন টাকা-পয়সা জমা প্রদান করতে হয় না। 

অনেক স্কলারে মতে ‘হক-সূফা’ একটি দুর্বল প্রকৃতির অধিকার। ‘হক-সূফা’  প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এবং আদালতে প্রতিকার পেতে হলে তলব-ই-মৌসিবত’ এবং ‘তলব-ই-ইশাদ’ এর আনুষ্ঠানিকতা যথাযথ ভাবে সম্পন্ন হয়েছে সেটি যথাযথ সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণ করতে হবে।

জারি কার্যক্রম: বিবাদী অগ্রক্রয়কৃত জমির দখল ডিক্রিদার বরাবর বুঝিয়ে না দিলে ডিক্রিদারপক্ষ আদালতে জারি মামলা করে আদালত যোগে দখল বুঝে নিতে পারতেন। বর্তমানে পৃথক জারি মামলা করার প্রয়োজন নেই। ২০২৫ সালের সংশোধনী অনুযায়ী মামলায় ডিক্রি হবার পর বিবাদী দখল হস্তান্তর না করলে মূল মামলাতেই দরখাস্ত দাখিল করে দখল বুঝে নিতে পারবেন ( আদেশে ২১, বিধি ১০৪, সিপিসি, ১৯০৮)।

রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ এর ৯৬ ধারা এবং অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৪৯ এর ২৪ ধারা অনুযায়ী অগ্রক্রয় বিষয়ে জানতে ভিজিট করুন https://ainjanun.com/ogrokroy-preemption/

https://ainjanun.com/ogrokroy-preemption/

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *