বাংলাদেশে একজন হিন্দু নারী কি ডিভোর্স দিতে পারবেন?

একজন হিন্দু নারী তার স্বামী থেকে কখন পৃথক বসবাস এবং ভরণপোষণের অধিকার পেতে পারেন সে বিষয়ে বিস্তারিত-

হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদযোগ্য নয়। তাই একজন হিন্দু নারী বা পুরুষ ডিভোর্স দিতে পারেন না। মুসলিম বিবাহের সাথে হিন্দু বিবেহের দর্শনগত পার্থক্য রয়েছে। মুসলিম বিবাহকে গণ্য করা হয় সামাজিক চুক্তি বা Social Contract হিসেবে। অপরদিকে হিন্দু ধর্মে বিবাহকে বিবেচনা করা হয় একটি পবিত্র ধর্মীয় সংস্কার বা Religious Sacrament হিসেবে। হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী বিবাহ কেবল দুটি দেহের মিলন নয়, দুটি আত্মার মিলন। এই মিলন কেবল পার্থিব জীবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি জন্ম-জন্মান্তরে মিলন হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদযোগ্য নয়।

এখন প্রশ্ন হলো কোন স্বামী যদি স্ত্রীকে নির্যাতন করে, স্বামী যদি অন্য নারীতে আসক্ত হয় বা অন্য নারীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে তাহলে স্ত্রীর করণীয় কী? আইনই বা এ বিষয়ে কী বলে? আজকে এই লেখায় আমরা সেই প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবো।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে একজন হিন্দু নারী বিবাহ বিচ্ছেদ করতে না পারলেও স্বামী থেকে পৃথক বসবাসের অধিকার পেতে পারেন। সেক্ষেত্রে স্ত্রী পৃথক বসবাস করলেও ভরণপোষণ স্বামীকেই বহন করতে হয়। The Hindu Married Women’s Right to Separate Residence and Maintenance Act, 1946 অনুযায়ী একজন স্ত্রী নিম্নবর্ণিত কারণসমূহে পৃথক বসবাসের অধিকার পেতে পারেন-

  • স্ত্রীর মাধ্যমে ছাড়ায়নি এমন কোন সংক্রামক রোগে স্বামী যদি আক্রান্ত হয়ে থাকে;
  • স্ত্রীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা হলে;
  • স্ত্রীকে পরিত্যাগ করলে অর্থাৎ কোন খোঁজ-খবর না রাখলে;
  • স্বামী অন্য নারীকে বিবাহ করলে;
  • স্বামী উপপত্নি বা রক্ষিতা রাখলে;
  • এই কারণগুলো ছাড়াও যেকোন ন্যায়সঙ্গত কারণে।

এই আইন অনুযায়ী আদালত স্ত্রীর অনুকূলে পৃথক বসবাসের ডিক্রি প্রদান করলে স্ত্রী পৃথক ভাবে বাসা ভাড়া করে অথবা স্বামীর পৃথক বাড়িতে বসবাস করতে পারবেন। স্ত্রীর ভরণপোষণ স্বামীই বহন করবেন। ডিক্রি প্রদান কালে আদালত ভরণপোষণের হারও নির্ধারণ করে দিবেন। ভরণপোষণের হার বা পরিমাণ কেমন হবে সেটি নির্ধারণে আদালত স্বামী-স্ত্রীর সামাজিক অবস্থান, স্বামীর পেশা, আয়-উপার্জন ইত্যাদি বিবেচনা করবেন। স্ত্রী যতদিন বেঁচে থাকবেন তত দিন এভাবে ভরণপোষণ পেতে থাকবেন। তবে স্বামী যদি মারা যান তাহলে তিনি আর ভরণপোষণ পাবেন না।

পৃথক বসবাসের ডিক্রি পেতে কোথায় যেতে হবে এবং কী করতে হবে?

পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পারিবারিক আদালত রয়েছে। প্রত্যেক উপজেলার জন্য যে সহকারী জজ আদালত/ সিনিয়র সহকারী জজ আদালত রয়েছে সেটিই পারিবারিক আদালত হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও অনেক জেলায় পৃথক পারিবারিক আদালত রয়েছে। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান নির্বিশেষে ‘পারিবারিক আদালত’ সকল ধর্মের মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। কোন হিন্দু নারী তার স্বামীর থেকে পৃথক ভাবে বসবাস করতে চাইলে এবং ভরণপোষণ চাইলে পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে।

আপনি সরাসরি মামলা না করে প্রথমে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সহযোগিতা নিতে পারেন। প্রত্যেক জেলার জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনে বা তার সন্নিকটেই জেলা লিগ্যাল এইড অফিস রয়েছে। জেলা লিগ্যাল এইড অফিস আপনাকে যাবতীয় আইনি পরামর্শ প্রদান করবেন, আপোস মীমাংসার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবেন। এছাড়া আপনি যদি আর্থিক ভাবে অস্বচ্ছল এবং অসহায় হন তাহলে লিগ্যাল এইড অফিস আপনার মামলার যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করে আইনি সহায়তা প্রদান করবেন।

আর আপনি যদি সরাসরি আদালতের দ্বারস্থ হতে চান তাহলে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর শরণাপন্ন হয়ে আদালতে আরজি দাখিলের মাধ্যমে মামলা দায়ের করতে পারবেন।

লিগ্যাল এইড বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন-

https://ainjanun.com/legalaid-binamulle-aini-sheba/

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *