বিয়ে মানব জীবনের এক পবিত্র বন্ধন। আমাদের সমাজে বিয়ের ক্ষেত্রে কাবিননামা বা নিকাহনামা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। বৈবাহিক সম্পর্কের প্রমাণ, স্বামী-স্ত্রীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, সন্তানের পৈত্রিক পরিচয় ও অধিকার, উত্তরাধিকার—এসব ক্ষেত্রে কাবিননামা একটি অকাট্য প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কাবিননামা না থাকলে কি বিবাহ অবৈধ হয়ে যায়? চলুন, আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশদভাবে জেনে নেওয়া যাক।
কাবিননামা কি বিবাহের জন্য অপরিহার্য?
না, মুসলিম বিবাহের বৈধতার জন্য কাবিননামা অপরিহার্য নয়। বিবাহ নিবন্ধন করা রাষ্ট্রীয় আইনের বাধ্যবাধকতা, কিন্তু এটি বিবাহের বৈধতার সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নয়।
মুসলিম বিবাহ কখন যথার্থভাবে সম্পন্ন হয়? ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, একটি মুসলিম বিবাহের জন্য কিছু আবশ্যিক শর্ত পূরণ হওয়া জরুরি:
- ইজাব (প্রস্তাব): একজন পক্ষ থেকে বিবাহের প্রস্তাব আসতে হবে।
- কবুল (সম্মতি): অন্য পক্ষকে সেই প্রস্তাবে সম্মতি জানাতে হবে।
- সাক্ষী: বিবাহের সময় দুজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সাক্ষী, অথবা একজন পুরুষ ও দুজন নারী সাক্ষী উপস্থিত থাকতে হবে।
- মোহর (দেনমোহর): স্ত্রীকে মোহরানা প্রদানের অঙ্গীকার থাকতে হবে।
যদি এই শর্তগুলো পূরণ হয়, তবে একটি মুসলিম বিবাহ শরিয়াহ অনুযায়ী বৈধ বলে গণ্য হয়।
বিবাহ নিবন্ধন: রাষ্ট্রীয় আইন ও শাস্তি
বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী, প্রতিটি মুসলিম বিবাহ এবং বিবাহ বিচ্ছেদ নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নিকাহ রেজিস্টারের (কাজী) নিকট বিবাহটি নিবন্ধন করতে হয়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো:
- বিবাহ নিবন্ধনের প্রধান দায়ভার কনের নয়, বরের।
- যদি বর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিবাহ নিবন্ধন না করান, তবে এটি একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
- এই অপরাধের জন্য বর ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
সুতরাং, দেখা যাচ্ছে যে বিবাহ নিবন্ধন করা রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা পরিচালিত একটি বিষয়। এটি অবজ্ঞা করলে শাস্তির বিধান রয়েছে, তবে এর অভাবে বিবাহের বৈধতা প্রভাবিত হয় না। অর্থাৎ, কাবিননামা না থাকলেও বিবাহ বৈধ থাকতে পারে।
কাবিননামা না থাকলে কি আইনের আশ্রয় পাওয়া যাবে?
হ্যাঁ, কাবিননামা না থাকলেও আইনের আশ্রয় লাভের সুযোগ অবশ্যই রয়েছে, যদিও কিছু ক্ষেত্রে আইনি সুবিধা পেতে অসুবিধা হতে পারে।
যদি কোনো পুরুষ এবং নারী স্বামী-স্ত্রী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করেন এবং তাদের প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন ও সমাজ যদি তাদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবেই জানেন ও বিশ্বাস করেন, তাহলে কাবিননামা না থাকলেও তাদের বিবাহ বৈধ বিবাহ হিসেবেই গণ্য হতে পারে।
এই বিষয়ে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় রয়েছে। মোছাঃ মমতাজ বেগম বনাম আনোয়ার হোসেন (সিভিল আপীল নং ১৩৯/২০০৩) মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ের ২৩ নং পাতায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগ বলেছেন, “দীর্ঘদিন স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বসবাস করলে বিবাহের Direct proof না থাকলেও বিবাহ অনুমান করে নেওয়া যাবে।”
এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কাবিননামা না থাকলেও যদি বিবাহের অন্যান্য শর্ত পূরণ হয় এবং সমাজের কাছে তাদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচিতি থাকে, তবে সেই বিবাহ বৈধ বলে গণ্য হয় এবং বৈধ বিবাহের আইনানুগ সকল সুবিধা ও অধিকার (যেমন: উত্তরাধিকার, ভরণপোষণ, সন্তানের স্বীকৃতি ইত্যাদি) লাভ করা সম্ভব।