পিতা সন্তানের ভরণপোষণ না দিলে কীভাবে আদায় করা যাবে?

52e382ef 15df 4bd4 A8e2 16d74d94744c E1756961828589 300x279
পিতা সন্তানের ভরণপোষণ না দিলে আদায় করার পদ্ধতি; বিস্তারিত আলোচনা 

সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব তার পিতার উপরে বর্তায়। পুত্র সন্তান সাবালকত্ব অর্জন না করা পর্যন্ত, কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে বিবাহ না হওয়া পর্যন্ত এবং অক্ষম সন্তানের ক্ষেত্রে উপার্জনক্ষম না হওয়া পর্যন্ত পিতার নিকট হতে ভরনপোষণ পাবার অধিকারী।  ভরণপোষণের মধ্যে সন্তানের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান সহ স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অন্তর্ভুক্ত। পিতা যদি তার সন্তানের ভরণপোষণ ঠিকমত প্রদান না করেন তাহলে নাবালক সন্তান বা তার পক্ষে তার মাতা অথবা উপযুক্ত কেউ আদালতে মামলা দায়ের করে ভরণপোষণ আদায় করে নিতে পারবেন। উক্ত ভরণপোষণ আদায় করতে কোথায় যাবেন কী করবেন সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-

কোথায় যাবেন কী করবেন: নাবালক সন্তান ও স্ত্রীর ভরণপোষণ আদায়ের এখতিয়ার সম্পন্ন আদালত হলো পারিবারিক আদালত। প্রত্যেক উপজেলার জন্য নির্ধারিত সহকারী জজ আদালত / সিনিয়র সহকারী জজ আদালত ‘পারিবারিক আদালত’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকে। এছাড়া অনেক জেলায় ‘পারিবারিক আদালত’ নামে পৃথক আদালত রয়েছে। তবে সেই পারিবারিক আদালত গুলো সাধারণত মামলা ফাইলিং আদালত নয়, কেবল বিচারিক আদালত হিসেবে কাজ করে থাকে। ভরণপোষণের দাবিতে মামলা করার জন্য একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর শরণাপন্ন হয়ে আরজি প্রস্তুত করতে হবে। আরজিতে অবশ্যই যে বিশয়গুলো উল্লেখ করতে হবে, সেগুলো হলো-

১। বাচ্চার জন্ম গ্রহণের তারিখ;

২। বাচ্চার পিতা কবে থেকে বাচ্চার ভরণপোষণ প্রদান করেন না;

৩। কত তারিখে বাচ্চার ভরণপোষণ দাবী করা হয়েছিলো এবং বাচ্চার পিতা কত তারিখে ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করেন;

৪। বাচ্চার পিতার আর্থ-সামাজিক অবস্থা ;

৫। বাচ্চার জন্য মাসিক কত টাকা হারে ভরণপোষণ দাবী করছেন; ইত্যাদি।

আরজির সাথে বাচ্চার পিতা-মাতার নিকাহনামা (কাবিননামা) এবং বাচ্চার জন্মনিবন্ধন সনদ বা টিকা কার্ডের কপি আদালতে দাখিল করতে হবে। পূর্বে পারিবারিক মামলায় ২৫ টাকা কোর্ট ফি নির্ধারিত থাকলেও পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ এর ২৫ ধারা অনুযায়ী ২০০ টাকা কোর্ট ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই ভরণপোষণের মামলা দায়ের করার সময় ২০০ ( দুই শত) টাকা কোর্ট ফি প্রদান করতে হবে।

উল্লেখ্য হিন্দু,মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সকল ধর্ম নির্বিশেষে ভরণপোষণের মামলা পারিবারিক আদালতে দায়ের করতে হয়। সালিশী পরিষদ (Arbitration Council) বাচ্চাদের ভরণপোষণ নির্ধারণ করতে পারে না। মুসলিম পারিবারিক আইন আধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৯ ধারায় যে ‘সালিশী পরিষদ’ এর কথা বলা হয়েছে সেটি কেবল স্ত্রীর ভরণপোষণ সংক্রান্ত বিষয়ে প্রযোজ্য। সরদার মোহাম্মদ বনাম মোছাঃ নাছিমা বিবি, 19 DLR (WP) 50 মামলায় বলা হয়েছে,  ‘সালিশী পরিষদ’ বাচ্চার ভরণপোষণ নির্ধারণ করলে তা অবৈধ হবে।  

পিতা কখন সন্তানের ভরণপোষণ দিতে বাধ্য নন: স্বাভাবিক ভাবে একজন পিতা তার সন্তানের ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। তবে পুত্র সন্তান যদি সাবালকত্ব অর্জন করে তাহলে পিতা উক্ত পুত্রকে ভরণপোষণ প্রদান করতে বাধ্য নন। কন্যা সন্তান বিবাহ না হওয়া পর্যন্ত তার পিতার নিকট হতে ভরণপোষণ পেতে হকদার।  কন্যার বিবাহ হয়ে গেলে পিতা উক্ত কন্যার ভরণপোষণ প্রদান করতে বাধ্য নন। নাবালক সন্তান যদি তার নিজ সম্পত্তি হতে নিজের ভরণপোষণ বহন করতে পারে তাহলে পিতা উক্ত সন্তানের ভরণপোষণ প্রদান করতে বাধ্য নন। পিতা যদি দরিদ্র ও রুগ্ন হন এবং উপার্জন করতে অক্ষম হন তাহলে সন্তানের ভরণপোষণ প্রদানের দায়িত্ব মাতার উপরে বর্তায়। মাতাও যদি দরিদ্র হয় তাহলে ভরণপোষণের দায়-ভার দাদার উপরে বর্তায়।

পিতা যদি নাবালক পুত্র বা নাবালিকা কন্যাকে নিজ হেফাজতে পাবার অধিকারী হন এবং নিজের কাছে রেখে লালন পালন করতে চান সেক্ষেত্রে নাবালক/নাবালিকা পৃথক ভরণপোষণ পাবার অধিকারী হবেন না। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে পৃথক ভরণপোষণ পাবার হকদার হতে পারেন। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিস্কার করা যেতে পারে-

লিমার বয়স ১৩ বছর। তার বাবা ও মায়ের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে। লিমা তার মায়ের হেফাজতে রয়েছে। লিমার বাবা প্রতি মাসে লিমার ভরণপোষণ বাবদ ৫ হাজার টাকা করে দেয়। লিমা বয়সঃসন্ধি অর্জন করায় লিমার বাবা তার নিজ হেফাজতে নিতে অধিকারী। লিমার বাবা এখন চান লিমা তার বাবার বাড়িতে থেকে লালিত-পালিত হোক। এখন লিমা যদি তার পিতার হেফাজতে যেতে অস্বীকৃতি জানান, তাহলে লিমার বাবা উক্ত ৫ হাজার টাকা হারে ভরণপোষণ দেয়া বন্ধ করে দিতে পারেন। কারণ পিতা নিজ হেফাজতে নিতে চাইলেও লিমা স্বেচ্ছায় তার পিতার হেফাজতে যেতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। তবে বিষয়টি যদি এমন হয় যে লিমার বাবা অন্যত্র বিবাহ করেছে, সেখানে গেলে সৎ মায়ের দ্বারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের আশংকা রয়েছে, সেক্ষেত্রে লিমা তার পিতার হেফাজতে যেতে অস্বীকৃতি জানালেও পৃথক ভরণপোষণ পাবার অধিকারী হবেন।  

ভরণপোষণের মামলা কতদিনের মধ্যে দায়ের করতে হয়?

ভরণপোষণের মামলা কত দিনের মধ্যে দায়ের করতে হবে সে বিষয়ে তামাদি আইনে সুনির্দিষ্ট ভাবে কিছু বলা নেই। যেসকল বিষয়ে তামাদি মেয়াদ সুনির্দিষ্ট ভাবে বলে হয়নি সেসকল ক্ষেত্রে তামাদি আইন, ১৯০৮ এর প্রথম তপসিলের ১২০ নং অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হয়ে থাকে। ১২০ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তামাদি মেয়াদ ৬ বছর। বিবাদী (পিতা) যেদিন ভরণপোষণ প্রদান করতে অস্বীকৃতি জানাবে সেদিন হতে ৬ বছরের মধ্যে পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে। উক্ত তামাদি মেয়াদের মধ্যে মামলা করা না হলে প্রতিকার পাওয়া যাবে না।

ভরণপোষণের হার:  একজন নাবালক বা নাবালিকার মাসিক ভরণপোষণের হার কেমন হবে তা বিভিন্ন বিষয়ের উপরে নির্ভর করে। বিবাদীর আর্থিক অবস্থা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, শারীরিক কর্মক্ষমতা, বাচ্চার বয়স, লেখাপড়া, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার স্বাভাবিক ব্যয় ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে বাচ্চার মাসিক ভরণপোষণের হার নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। বাচ্চার বাবা যদি সাধারণ দিনমজুর হয় তাহলে ভরণপোষণের হার যেমন হবে বাচ্চার বাবা উচ্চ শিক্ষিত ও ভালো মানের চাকুরিজীবী বা ব্যাবসায়ী হলে নিশ্চয়ই ভরণপোষণের হার এক রকম হবে না।  বিজ্ঞ আদালত সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তার প্রজ্ঞা দিয়ে ভরণপোষণের হার নির্ধারণ করে থাকেন। 

ভরণপোষণ মামলায় ডিক্রি পাবার পরে করনীয়ঃ আদালত ভরণপোষণের ডিক্রি প্রদান করলে ডিক্রিকৃত অর্থ পরিশোধের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় প্রদান করেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করলে আদালত বিবাদীর বিরুদ্ধে লেভী ওয়ারেন্ট জারী করে বিবাদীর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নিলামে বিক্রয়ের মাধ্যমে টাকা আদায় করতে পারে। লেভী ওয়ারেন্টের মাধ্যমে টাকা আদায় সম্ভব না হলে অনূর্ধ্ব ৩ মাস বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করে গ্রেফতারি পরওয়ানা জারী করতে পারে। আদালত স্বীয় উদ্যোগে অথবা ডিক্রিদারের আবেদনের প্রেক্ষিতে উক্ত পদক্ষেপগুলো নিতে পারে। 

গরীব ও অসহায়দের জন্য করনীয়ঃ আপনি যদি আর্থিক ভাবে অস্বচ্ছল ও অসহায় হয়ে থাকেন তাহলে জেলা লিগ্যাল এইডের সহযোগিতা গ্রহণ করতে পারেন। বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষেরি সরকারি আইনগত সহায়তা পাবার অধিকার রয়েছে। আপনি সরাসরি মামলা দায়ের না করে প্রথমে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের শরণাপন্ন হতে পারেন। প্রত্যেক জেলার জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবন বা তার সন্নিকটেই জেলা লিগ্যাল এইডের অফিস অবস্থিত । তারা আপনাকে আইনগত পরামর্শ এবং প্রয়োজনে সার্বিক আইনগত সেবা প্রদান করবেন। লিগ্যাল এইড অফিসে আপনি ভরণপোষণের দাবি করে দরখাস্ত/ আবেদন করলে অপরপক্ষকে ডেকে আপোস মীমাংসার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করবেন। আপোস মীমাংসার মাধ্যমে সমাধান না হলে লিগ্যাল এইড অফিস উপযুক্ত বিবেচনা করলে আপনার জন্য আইনজীবী নিয়োগ সহ মামলার যাবতীয় খরচ বহন করে আপনাকে আইনগত সেবা প্রদান করবে।

লিগ্যাল এইড বিষয়ে বিস্তারিত জানতে এই লিংকে প্রবেশ করুন।  

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *