
পিতা-মাতাকে সঠিক ভাবে ভরণপোষণ প্রদান করা সন্তানের কেবল নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সন্তানের নিকট হতে যথাযথ ভরণপোষণ পাওয়া প্রতিটি বাবা-মায়ের আইনগত অধিকারও বটে । বাংলাদেশে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ এই অধিকারকে আইনি সুরক্ষা দিয়েছে। এই আইনের মূল বিষয়গুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
পিতা-মাতার ভরণপোষণ বলতে কী বোঝায়?
আইন অনুযায়ী, ভরণপোষণ বলতে শুধু আর্থিক সহায়তা বোঝায় না, বরং এর মধ্যে রয়েছে:
- খাওয়া-দাওয়া: পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ।
- বস্ত্র: পরিধানের জন্য প্রয়োজনীয় কাপড় সরবরাহ।
- চিকিৎসা: অসুস্থতার সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা ও ঔষধের ব্যবস্থা।
- বাসস্থান: বসবাসের জন্য উপযুক্ত স্থানের ব্যবস্থা।
- সঙ্গ প্রদান: পিতা-মাতার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, খোঁজখবর নেওয়া এবং তাদের মানসিক সুস্থতার জন্য সময় দেওয়া।
আইনের মূল বিধানাবলী
- প্রত্যেক সন্তানের দায়িত্ব: প্রতিটি সন্তানকে তার পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে তারা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে এই দায়িত্ব পালন করবে।
- একত্রে বসবাস: পিতা-মাতাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধাশ্রম বা অন্য কোথাও একত্রে বা আলাদাভাবে বসবাস করতে বাধ্য করা যাবে না। সম্ভব হলে তাদের সঙ্গে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করতে হবে।
- স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা: সন্তানকে নিয়মিত পিতা-মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে খোঁজখবর রাখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা ও পরিচর্যা করতে হবে।
- নিয়মিত সাক্ষাৎ: যদি পিতা-মাতা সন্তানদের থেকে পৃথকভাবে বসবাস করেন, তাহলে প্রত্যেক সন্তানকে নিয়মিত তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে।
- আর্থিক সহায়তা: যদি পিতা-মাতা সন্তানদের সাথে বসবাস না করে পৃথকভাবে বসবাস করেন, তাহলে প্রত্যেক সন্তানকে তাদের দৈনন্দিন আয়-রোজগার বা মাসিক/বার্ষিক আয় থেকে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ নিয়মিতভাবে পিতা-মাতাকে প্রদান করতে হবে।
- দাদা-দাদী, নানা-নানীর ভরণপোষণ: পিতা-মাতার অবর্তমানে দাদা-দাদী এবং নানা-নানীকে ভরণপোষণ দিতে সন্তান বাধ্য থাকবে। এই ভরণপোষণ পিতা-মাতার ভরণপোষণ হিসাবে গণ্য হবে।
আইন অমান্য করলে শাস্তি
যদি কোনো সন্তান এই আইনের বিধান লঙ্ঘন করে পিতা-মাতার ভরণপোষণ না দেয় বা অবহেলা করে, তাহলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে। এই অপরাধের জন্য:
- অর্থদণ্ড: সর্বোচ্চ ১ (এক) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড হতে পারে।
- কারাদণ্ড: অর্থদণ্ড অনাদায়ে সর্বোচ্চ ৩ (তিন) মাস কারাদণ্ড হতে পারে।
এছাড়াও, কোনো সন্তানের স্ত্রী, স্বামী, পুত্র-কন্যা বা অন্য কোনো নিকট আত্মীয় যদি পিতা-মাতা বা দাদা-দাদী বা নানা-নানীর ভরণপোষণে বাধা প্রদান করে বা অসহযোগিতা করে, তাহলে তারাও একই অপরাধে সহায়তা করার জন্য উপরিউক্ত দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
আইনি প্রতিকার
কোনো পিতা-মাতা যদি সন্তানের দ্বারা অবহেলিত হন বা ভরণপোষণ না পান, তাহলে তারা সরাসরি প্রথম শ্রেণীর জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন। এই আইনের অধীনে সংঘটিত কোন অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য এবং আপোসযোগ্য হবে। পক্ষগণ চাইলে নিজেদের মধ্যে আপোস মীমাংসা করে নিতে পারবেন।
আদালত এই অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু করতে পারেন অথবা আপোস-নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার, সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলরের নিকট প্রেরণ করতে পারেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার, সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলরের নিকট প্রেরণ করা হলে উভয়পক্ষকে শুনানীর সুযোগ প্রদান করে অভিযোগটি নিষ্পত্তি করবেন। এরূপ নিষ্পত্তিকে উপযুক্ত আদালত কর্তৃক নিষ্পত্তি বলে গণ্য করা হবে।
আপনি যদি আর্থিক ভাবে অস্বচ্ছল হয়ে থাকেন সেক্ষেত্রে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সহযোগিতা নিতে পারেন। তারা আপনাকে আইনগত পরামর্শ থাকে শুরু করে যাবতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান করবেন। জেলা লিগ্যাল এইডের সেবা পেতে কোথায় যাবেন, কী করবেন এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখা একটি আর্টিকেল রয়েছে , সেটি পড়ে নিতে পারেন।
আমাদের সমাজে একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে একক ও ছোট ছোট পরিবারে রুপান্তরিত হওয়ায় অনেকেই আজ পিতা-মাতা ছাড়া বসবাস করেন। অনেকে পিতা-মাতা ছেড়ে দূরে, অনেক দূরে, ভিন্ন কোন দেশে বসবাস করেন। সন্তানের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বাবা-মায়েরা বিষয়টি মেনে নেন। কিন্তু জীবন সায়াহ্নে অনেক বাবা-মা সন্তানদের দ্বারা তীব্র অবহেলার শিকার হন। এই আইনটিতে আমরা দেখতে পেলাম বাবা-মা কে বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে বাধ্য করা যাবে না। দেখা সাক্ষাৎ করতে হবে নিয়মিত। যারা বাবা-মা ফেলে নিজের ক্যারিয়ার আর ভবিষ্যৎ গড়ার এক দুর্নিবার প্রতিযোগিতায় মগ্ন থাকেন, তারা কি ফিরে দেখবেন না তাদের সেই সোনালী শৈশব? যে শৈশব রঙ্গিন হয়ে আছে পিতা-মাতার ব্যক্ত-অব্যক্ত অজস্র ত্যাগ, ধৈর্য আর কষ্ট সহিষ্ণুতার মধ্য দিয়ে।
এই আইনটি আমাদের দেশে ২০১৩ সালে প্রণিত হলেও এখন পর্যন্ত মামলা দায়েরের সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে অনেক কম। এর অন্যতম একটি কারণ হলো আমাদের দেশের বাবা মায়েরা চান না তার সন্তানের বিরুদ্ধে কোন মামলা করতে। এটি বাবা-মায়েদের ঔদার্যের এক বিরাট বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করি। তবুও কিছু সময় আইনের আশ্রয় গ্রহণ ছাড়া বিকল্প থাকে না। এই আইনটি বয়স্ক পিতা-মাতার অধিকার রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা সমাজে তাদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।