বাচ্চাকে নিজ হেফাজতে রাখার বা পাওয়ার অধিকার

নাবালক সন্তানের হিজানত (Right to custody of child) বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন…

মিঃ আরেফিন সাহেবের সাথে শাম্মীর ডিভোর্স হয়ে গেছে। তাদের ৬ বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। ডিভোর্সের পর থেকেই আরেফিন সাহেব বাচ্চাটাকে নিজ হেফাজতে রেখেছে। এদিকে শাম্মী চান বাচ্চাটি তার কাছে থাকুক।

এমন ঘটনা আমাদের সমাজে অহরহ ঘটে চলেছে। বাচ্চার মা এবং বাবা উভয়েই চান বাচ্চাকে নিজ হেফাজতে রেখে লালন পালন করতে। আজকের লেখায় নাবালক শিশু হেফাজতে রাখার বা পাওয়ার প্রচলিত আইন-কানুন গুলো আমরা জানার চেষ্টা করবো।

হিজানত শব্দটি আরবি ভাষার শব্দ এর অর্থ হলো শিশুর তত্ত্বাবধান বা লালন পালনের অধিকার। পিতা-মাতার মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ হলেও মা তার সন্তানের হিজানত পেতে পারেন। পুত্র সন্তানের ক্ষেত্রে ৭ বছর এবং কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত মা তার সন্তানকে নিজ হেফাজতে রেখে লালন পালন করার অধিকারী। সন্তানের মা পারিবারিক আদালতে তার সন্তানের হিজানত দাবী করে মামলা করতে পারেন। এক্ষেত্রে আদালত ‘বাচ্চার সর্বোত্তম কল্যাণ’ নীতি অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। ‘বাচ্চার সর্বোত্তম কল্যাণ’ নীতি হলো যার হেফাজতে প্রদান করা হলে বাচ্চাটি ভালো থাকবে এবং সুন্দর ভাবে বিকশিত হবে বাচ্চাটিকে তার হেফাজতেই রাখতে হবে। 

 ধরুন বাচ্চার মা অন্যত্র বিবাহ করে ঘর-সংসার করছে এমন অবস্থায় বাচ্চাটিকে মায়ের হেফাজতে রাখলে বাচ্চাটি পর্যাপ্ত পরিচর্যা নাও পেতে পারে , অপর দিকে বাচ্চার পিতা অন্যত্র বিবাহ করেনি এবং বাচ্চার দাদা-দাদীকে নিয়ে বসবাস করছে, এমন অবস্থায় আদালতের নিকট মনে হলো বাচ্চাটি তার বাবার হেফাজতেই ভালো থাকবে। সেই বাচ্চার বয়স যদি ৭ বছর নাও হয় বা মেয়ে বাচ্চার ক্ষেত্রে বয়ঃপ্রাপ্ত নাও হয় তবুও আদালত বাচ্চার সর্বোত্তম কল্যাণ বিবেচনা করে মায়ের আবেদন নামঞ্জুর করে পিতার হেফাজতে প্রদানের আদেশ দিতে পারেন।

অন্য দিকে ছেলে বাচ্চার বয়স যদি ৭ বছর পার হয়ে যায় বা মেয়ে বাচ্চা যদি বয়ঃসন্ধিকাল পার করেন আর আদালতের নিকট যদি মনে হয় বাচ্চাটি তার বাবার থেকে মায়ের কাছে ভালো এবং সুরক্ষিত থাকবে তাহলে আদালত বাবার হেফাজতে না দিয়ে মায়ের হেফাজতে দিতে পারেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে বাচ্চার বয়স নয়, বরং বাচ্চার কল্যাণটাই মূখ্য।

কোথায় যাবেন? কী করবেন?

নাবালক বাচ্চার হিজানত ( Custody) প্রার্থনা করে বাবা বা মা যে কেউই আবেদন করতে পারেন। পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ এর ৫(ঙ) ধারা অনুযায়ী শিশু সন্তানের অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধানের এখতিয়ার সম্পন্ন আদালত হলো পারিবারিক আদালত। আপনার জেলার সংশ্লিষ্ট পারিবারিক আদালতে ২০০ টাকা কোর্ট ফি দিয়ে বাচ্চাকে নিজ হেফাজতে রাখার মামলা করতে হবে। মামলা করার জন্য পারিবারিক আইন বিষয়ে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর শরণাপন্ন হয়ে আরজি প্রস্তুত করে কোর্টে মামলা দায়ের করতে হবে। আরজিতে অবশ্যই বাচ্চার নাম, বয়স, বা চ্চাকে কী কারণে নিজের হেফাজতে রাখতে চান ইত্যাদি সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ করতে হবে। কাগজপত্র হিসেবে আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, বাচ্চার জন্ম নিবন্ধন সনদ/ টিকা কার্ডের কপি জমা দিতে হবে। বাচ্চার জন্ম নিবন্ধন সনদ/ টিকা কার্ডের কপি আপনার কাছে না থাকলে সেটি কেন নেই বা কার কাছে রয়েছে তা আরজিতে উল্লেখ করতে হবে।  

মামলা দায়েরের পর অপরপক্ষের প্রতি সমন ইস্যু হবে। অপরপক্ষ জবাব দিলে তা মূল বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাবে এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতের নিকট যদি মনে হয় বাদীর হেফাজতে বাচ্চাটিকে রাখা হলে বাচ্চার সর্বোত্তম কল্যাণ নিশ্চিত হবে তাহলে বাদীর পক্ষে রায়-ডিক্রি প্রদান করবেন। আর যদি আদালতের নিকট প্রতীয়মান হয় বাদীর হেফাজতে দিলে বাচ্চার সর্বোত্তম কল্যাণ নিশ্চিত হবে না, তাহলে আদালত মামলাটি খারিজ করে দিবেন।

অপরপক্ষ যদি সমন পাওয়ার পরেও আদালতে হাজির না হন তাহলে মামলাটি একতরফা শুনানীতে যাবে এবং একতরফা বিচার হয়ে রায়-ডিক্রি হয়ে যাবে। উল্লেখ্য সাক্ষ্য গ্রহণের সময় বিজ্ঞ বিচারক চাইলে বাচ্চার সাথে কথা বলতে পারেন এবং বাচ্চার মতামত জানতে চাইতে পারেন।  

লিগ্যাল এইড অফিসের ভূমিকা

আপনি সরাসরি আদালতে বাচ্চার হিজানত বা হেফাজতে গ্রহণের জন্য মামলা না করে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের সহযোগিতা গ্রহণ করতে পারেন। প্রতিটি জেলের জজ কোর্ট বিল্ডিং বা তার সন্নিকটেই জেলা লিগ্যাল এইড অফিস রয়েছে। লিগ্যাল এইড অফিসার নিয়োগ করা হয় বিজ্ঞ বিচারকমন্ডলির মধ্য থেকেই, তাই তারা আইন কানুন এবং বিরোধ নিষ্পত্তি বিষয়ে বিশেষ পারদর্শী হয়ে থাকেন। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে বাচ্চার হিজানত বিষয়ে আবেদন করা হলে লিগ্যাল এইড অফিস অপরপক্ষ বরাবর নোটিশ পাঠিয়ে নির্দিষ্ট দিনে হাজির হতে বলবেন। সেই নির্দিষ্ট তারিখে লিগ্যাল এইড অফিসার উভয়পক্ষের উপস্থিতিতে আপোস-মীমাংসার জন্য সভা করবেন এবং বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করবেন। আপোস মীমাংসা সফল হলে উভয়পক্ষের স্বাক্ষরে চুক্তিপত্র সম্পাদিত হবে। উক্ত চুক্তি উভয়পক্ষ মানতে বাধ্য থাকবেন।  

লিগ্যাল এইড বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন… https://ainjanun.com/legalaid-binamulle-aini-sheba/

https://ainjanun.com/legalaid-binamulle-aini-sheba/

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *